দেশজুড়ে চলা কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে বুধবার ভয়াবহ বজ্রপাতে একদিনেই ৮টি জেলায় ১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই মৃত্যুগুলোর পেছনে একটাই নির্মম বাস্তবতা স্পষ্ট—নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন কৃষক, জেলে কিংবা দিনমজুর। জীবিকার তাগিদে প্রতিকূল আবহাওয়াকেও উপেক্ষা করে বাইরে বের হওয়াই তাদের জন্য হয়ে উঠেছে মৃত্যুর কারণ।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে পটুয়াখালী জেলায়। সেখানে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, পাশাপাশি বজ্রপাতে অর্ধশতাধিক গরুও মারা গেছে—যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ডেকে এনেছে।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী এলাকায় সকাল ৯টার দিকে মাঠে গরু বাঁধতে গিয়ে প্রাণ হারান ২২ বছর বয়সী সৌরভ মজুমদার। একই জেলার কলাপাড়ার তারিকাটা গ্রামে দুপুর ১টার দিকে ভুট্টা ক্ষেতে কাজ করার সময় মারা যান ২৮ বছর বয়সী জহির উদ্দিন। এরপর দুপুর ২টার দিকে গরুকে ঘাস খাওয়াতে গিয়ে প্রাণ হারান ৫৫ বছর বয়সী সেতারা বেগম। প্রায় একই সময়ে মাঠ থেকে গরু নিয়ে ফেরার পথে মৃত্যু হয় শান্তিপুর গ্রামের খালেক হাওলাদারের (৫৫)।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় আরও দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। সকাল ৬টার দিকে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান শামীম মিয়া (৩৫)। তিনি এক কন্যা সন্তানের জনক। একই দিন সকাল ৯টার দিকে সড়ক নির্মাণকাজ চলাকালে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান ১৮ বছর বয়সী সাগর ইসলাম।
বরগুনার আমতলী উপজেলার পূজাখোলা এলাকায় ফসলের মাঠে জমে থাকা পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান কৃষক নূরজামাল (৫৪)। একই জেলার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা এলাকায় বলেশ্বর নদীতে মাছ ধরার সময় জেলে মো. আল-আমিনের মৃত্যু হয়। স্থানীয় প্রশাসন আমতলীতে নিহতের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দিয়েছে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার মজ্জৎকোল গ্রামে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। সকাল পৌনে ৭টার দিকে সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে বাজারে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে মারা যান সুমন মন্ডল (৩৫)। বজ্রের আঘাতে শিশুটি বাবার কোলে থেকে ছিটকে পড়লেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় দুপুর দেড়টার দিকে বাড়ির পাশের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সাদ্দাম হোসেন (২৮)। কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরেই তার জীবিকা চলত। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কাজীপাড়া গ্রামে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ির পাশে রান্নার জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান গৃহবধূ সাহেরা বেগম (৪০)।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় কীর্তিনাশা নদীতে মাছ ধরার সময় বজ্রাঘাতে মারা যান জেলে রাজিব শেখ (৩২)। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে তীরে আনলেও ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়ে যায়। উপজেলা প্রশাসন তার পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দিয়েছে।
অন্যদিকে, বাগেরহাট সদর উপজেলার সরকারডাঙ্গা গ্রামে বিকেলের দিকে ঝড়-বৃষ্টি কিছুটা কমে আসার পর মাঠে গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যান দিনমজুর রবিন হাওলাদার (৫৩)। বজ্রপাতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়।
এই একদিনের ঘটনাই যেন মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত, আর নিরাপত্তার অভাব কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সিভি/এইচএম

