বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ভিত্তি নারী শ্রমিক। তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, চা-বাগান, গৃহকর্ম, নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাত— প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।
তবে এই অগ্রগতির আড়ালে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, অনিরাপত্তা ও অধিকারবঞ্চনার এক কঠিন বাস্তবতা রয়ে গেছে।
শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা এখনও মজুরি বৈষম্য, যৌন হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা, মাতৃত্বকালীন সুবিধাবঞ্চনা এবং পদোন্নতিতে বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈষম্য শুধু লিঙ্গভিত্তিক নয়; এর সঙ্গে জড়িত সামাজিক মানসিকতা, শ্রমবাজারের কাঠামো এবং নীতিগত দুর্বলতা।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন আয়েশা আক্তার। বেতন-ভাতা বকেয়া এবং নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পর চাকরি হারান তিনি। দুই সন্তানের মা আয়েশা পরে আর গার্মেন্টসে ফিরতে পারেননি। বর্তমানে আমিনবাজারের একটি ইটভাটায় দৈনিক মজুরিতে কাজ করছেন। কাজ করলে আয় আছে, না করলে নেই।
আয়েশা জানান, পোশাক কারখানায় অনিরাপদ পরিবেশ, শ্রমিক অসন্তোষ এবং সন্তান নিয়ে কাজের অনুকূল ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই চাকরি ছাড়তে হয়েছে। তার মতো আরও অনেক নারী শ্রমিক গত দুই বছরে বিভিন্ন স্থানীয় ও সাব-কন্ট্রাক্টভিত্তিক কারখানা থেকে ছাঁটাই হয়েছেন।
শ্রম অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের পরিচালক কোহিনুর মাহমুদ বলেন, পোশাক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও নারীরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না। পাশাপাশি অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, যৌন হয়রানি, কম মজুরি, সন্তান লালন-পালনের চাপ এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতা নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
বিজিএমইএর ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৮০ সালে তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের হার ছিল ৮০ শতাংশ। ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশে। একসময় গ্রাম থেকে শহরে এসে জীবিকা বদলের স্বপ্ন নিয়ে অসংখ্য নারী এই খাতে যুক্ত হলেও এখন সেই প্রবণতায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ নারী। ২০১৭ সালে এই হার ছিল ৩৬ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কর্মরত নারীদের প্রায় ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। অর্থাৎ তারা এমন খাতে নিয়োজিত, যেখানে শ্রম আইন, সামাজিক সুরক্ষা বা চাকরির নিশ্চয়তা কার্যকর নয়।
কৃষিখাতেও নারীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও জমির মালিকানায় তাদের অংশ মাত্র ১২ শতাংশ। নারী কৃষিশ্রমিকেরা সাধারণত দৈনিক বা মৌসুমি ভিত্তিতে কাজ করেন এবং একই ধরনের কাজে পুরুষের তুলনায় গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম মজুরি পান। অনেক ক্ষেত্রে নারীর শ্রমকে পারিবারিক সহায়তা হিসেবে দেখানো হয়, ফলে তাদের কাজের আর্থিক মূল্যায়নও হয় না।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির জরিপে উঠে এসেছে, পোশাক খাতে ৭৩ শতাংশ নারী কর্মী কখনও পদোন্নতি পাননি। এছাড়া ৬৮ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি নিলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তাদের কাজের পরিবেশ ও মর্যাদার উন্নতি হয়নি। অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখলেও অধিকাংশ নারী এখনও অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করছেন এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে, যেখানে প্রায় ৪০ লাখ নারী কাজ করেন। কিন্তু একই কাজের জন্য নারীরা এখনও পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পান। অধিকাংশ কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা নেই বললেই চলে। ফলে অনেক নারী সন্তান নেওয়ার পর চাকরি চালিয়ে যেতে পারেন না।
গৃহকর্মী নারীদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। দেশে প্রায় ২০ লাখ নারী গৃহকর্মে যুক্ত থাকলেও তাদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, লিখিত চুক্তি বা ন্যায্য মজুরি কাঠামো নেই। শহরের বেসরকারি গৃহকর্মীদের গড় মাসিক আয় প্রায় সাত হাজার টাকা, যা জাতীয় ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম।
চা-বাগান ও নির্মাণশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের অবস্থাও নাজুক। চা-বাগানের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিক নারী হলেও তাদের দৈনিক মজুরি ১৭০ থেকে ১৮৫ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। নির্মাণশিল্পে কাজ করা নারীদের বড় অংশই নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন।
সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, শ্রম আইনে সমান কাজের জন্য সমান মজুরির কথা থাকলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে পদোন্নতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীরা বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার। শ্রমিক ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণও খুব কম, ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কণ্ঠ দুর্বল থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে শ্রম অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলো এখনও অনুস্বাক্ষর করা হয়নি। একই সঙ্গে শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থাও দুর্বল। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি ৭০ হাজার শ্রমিকের জন্য রয়েছেন মাত্র একজন পরিদর্শক। ফলে অধিকাংশ অভিযোগই কার্যকর নজরদারির বাইরে থেকে যায়।
শ্রম খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীকে ‘সহায়ক’ নয়, বরং অর্থনীতির সমান অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে শ্রম আইনের আওতায় এনে নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

