বৈশাখের শুরুতেই সারাদেশে বজ্রপাত নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। দিন যত যাচ্ছে, মৃত্যুর সংখ্যা ততই বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে জনমনে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা একে ‘নীরব দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন এবং কার্যকর ও ধারাবাহিক উদ্যোগের ঘাটতিকে দায়ী করছেন।
দেশে বজ্রপাত প্রতিরোধে ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত টিআর-কাবিখা প্রকল্পের আওতায় সড়কের দুই পাশে তালগাছ রোপণের কর্মসূচি চালু ছিল। শর্তসাপেক্ষে এ কার্যক্রমে বরাদ্দও দেওয়া হয়। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের পর থেকে এ খাতে আর কোনো আর্থিক বরাদ্দ নেই। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি পর্যায়ে আলাদা কোনো কর্মসূচিও দেখা যাচ্ছে না।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-২০ সালের মধ্যে দেশে ৩১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়। বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সর্বাধিক ২৬ শতাংশ ঘটে মে মাসে। ঋতুভিত্তিক বিশ্লেষণে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রায় ৫৯ শতাংশ বজ্রপাত হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ হার থাকে ৩৬ শতাংশ। মোট বজ্রপাতের প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে।
বাংলাদেশে বজ্রপাত বৃদ্ধির প্রধান কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বায়ুদূষণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেড়ে শক্তিশালী কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হচ্ছে। বনভূমি হ্রাস ও জলাভূমি ভরাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ভৌগোলিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একদিকে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বাতাস, অন্যদিকে হিমালয় থেকে নেমে আসা ঠাণ্ডা বাতাস—এই দুইয়ের সংঘর্ষে ‘কালবৈশাখী’র তীব্রতা বাড়ে। পাশাপাশি কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া এবং বাতাসে ভাসমান সালফেট ও ধূলিকণা মেঘে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে সহায়তা করে। নগরায়ণও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। কংক্রিটের স্থাপনা ও পিচঢালা রাস্তা তাপ ধরে রেখে স্থানীয় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বজ্র মেঘের ভেতরে চার্জ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
চলতি বৈশাখে বজ্রপাতে মৃত্যুর ধারা থামছে না। এপ্রিলের শুরুতেই নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একাধিক মৃত্যু ঘটে। ২২ ও ২৩ এপ্রিল কয়েক জেলায় ৪ থেকে ৫ জন নিহত হন। ২৬ এপ্রিল গাইবান্ধায় ৫ জন, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে ২ জন করে, পঞ্চগড়, বগুড়া ও নাটোরে ১ জন করে প্রাণ হারান। পরদিন নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নোয়াখালীসহ আরও কয়েক জেলায় মৃত্যুর খবর আসে। সর্বশেষ গত বুধবারও একাধিক জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
২০১৬ সালে এক বছরে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। একদিনেই মারা যান ৮২ জন। সেই বছর বজ্রপাতকে সরকার ‘দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপরই শুরু হয় তালগাছ রোপণের কর্মসূচি। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে মোট ৫৯ লাখ ৫ হাজার ৮৫৫টি তালগাছ রোপণ করা হয়। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ সালে ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৩০টি, ২০১৮-১৯ সালে ১৭ লাখ ২৯ হাজার ২৮টি, ২০১৯-২০ সালে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৮৬টি, ২০২০-২১ সালে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৫৮১টি এবং ২০২১-২২ সালে ২ লাখ ৮০ হাজার ২৩০টি গাছ রোপণ করা হয়।
এই কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের বরাদ্দও ছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কাবিটা কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৭১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩৮০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
তালগাছকে বজ্রপাত প্রতিরোধে প্রাকৃতিক ‘লাইটনিং রড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় ৯০ থেকে ১০০ ফুট উঁচু এই গাছ বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ শোষণ করে আশপাশের মানুষ ও প্রাণীকে সুরক্ষা দিতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় (১০ থেকে ১৫ বছর) লাগায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে ২০২২ সালের পর এ প্রকল্পে পরিবর্তন আসে। এরপর কিছু এলাকায় আধুনিক বজ্রনিরোধক টাওয়ার (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন শুরু হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও আলাদা কোনো স্থায়ী প্রকল্প আগে ছিল না। কাবিটা ও টিআর প্রকল্পের আওতায় সড়কের পাশে তালগাছ রোপণের শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল। ২০২২ সাল পর্যন্ত তা কার্যকর ছিল।
অন্য এক কর্মকর্তা জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথমে ১৫ জেলায় বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপনের জন্য সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে আরও ১৫ জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে ৩০ জেলায় ৪১৫টি টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৭টি সচল এবং ৫৮টি অচল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালগাছ রোপণের উদ্যোগ থাকলেও মাঝপথে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর সুফল পাওয়া যায়নি। এখন আবার নতুন করে এই উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানান, বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধি, সাইরেন স্থাপন, তালগাছ রোপণ এবং বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, বজ্রপাত জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখনো সমন্বিত ও কার্যকর কর্মসূচির অভাব রয়েছে।
বজ্রপাত মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক গবেষণা জরুরি। তালগাছ রোপণ একটি কার্যকর প্রাকৃতিক সমাধান হলেও তা স্থায়ীভাবে চালু না থাকায় সুফল সীমিত হয়েছে। ফলে প্রতি বছর বৈশাখ এলেই এই ‘নীরব দুর্যোগ’ আবারও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও মানবসৃষ্ট পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। জলাশয় ভরাট, বনভূমি হ্রাস এবং নগরায়ণ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। তাঁর মতে, উঁচু গাছ রোপণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সিভি/এম

