দেশের গুরুত্বপূর্ণ বোরো ধান উৎপাদন মৌসুম এবার বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে বিপুল পরিমাণ ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা ও চালের বাজারে মূল্য চাপ বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এ বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের চাষ ভালো হয়েছিল এবং কৃষকদের মধ্যে ভালো ফলনের আশা তৈরি হয়। কিন্তু এপ্রিলের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি সেই আশাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন হাওর এলাকায় ফসল কাটার শেষ পর্যায়েই মাঠ প্লাবিত হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি হাওর জেলায় এখনো প্রায় ১৭ শতাংশ পাকা ধান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে এ বছর বোরো চাষ হয়েছিল, যার বড় অংশই হাওরভিত্তিক নিম্নাঞ্চলে। এর মধ্যে ৭৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আনুমানিক গড় উৎপাদন অনুযায়ী, যদি এই এলাকার ধান সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কয়েক লাখ টন চাল উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব জাতীয় উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে পড়বে, কারণ দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ আসে এই মৌসুম থেকে।
বর্তমানে হাওর অঞ্চলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ধান কাটা শেষ হলেও অবশিষ্ট ফসল এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনে আরও বৃষ্টি এবং নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রাকৃতিক এই ধাক্কার পাশাপাশি সার ও জ্বালানি সংকটও উৎপাদনকে প্রভাবিত করেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে এ বছর বোরো উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ মনে করছেন, হাওর এলাকায় ক্ষতি ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, আর জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য পতন ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন কমে গেলে চালের বাজারে সরাসরি মূল্য চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের খাদ্য ব্যয়ে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকারের গুদাম মজুত ও আমদানি নীতি পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সামগ্রিকভাবে এবার হাওরের বোরো মৌসুমকে ঘিরে তৈরি হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতার বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়া এবং ফসল দ্রুত নিরাপদে ঘরে তুলতে পারার ওপর।

