বৈশাখের স্বল্প বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক দুর্ভোগ ও ক্ষতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, সড়ক অবকাঠামো এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই দিনের জলাবদ্ধতায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০ কোটিরও বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিবারের মতো এবারও বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে নিচু এলাকা দ্রুত প্লাবিত হওয়ায় নগরবাসীর পুরোনো আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। পানিতে ডুবে যায় দোকানপাট, নষ্ট হয় পণ্য, ব্যাহত হয় যান চলাচল। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিটি করপোরেশনের অবকাঠামোও।
এই জলাবদ্ধতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভোগে দুঃখ প্রকাশ করা হয় এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। তবে সেখানে গিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি দাবি করেন, জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রচারিত অনেক তথ্য অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর। এই বক্তব্যে নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা দেখা যায়।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জলাবদ্ধতার দায় বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার ওপর চাপানো হয়। বিশেষ করে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পানি সরবরাহ সংস্থার কার্যক্রমকে দায়ী করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে জানায়, চলমান খাল সংস্কারকাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়ায় পানি নিষ্কাশনে সাময়িক বাধা তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে গেছে শত শত দোকান। ওষুধ, সার্জিক্যাল পণ্য, খাদ্যসামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্য নষ্ট হয়েছে। শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কেই কয়েক কোটি টাকার পণ্য ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। অনেক ছোট ব্যবসায়ী তাদের জীবনের সঞ্চিত পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
নগরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়েছে। পানি নামার পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র—ভাঙা রাস্তা, নষ্ট ড্রেন, এবং জমে থাকা কাদা নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টির কারণে অনেক সড়কের উপরের স্তর উঠে গেছে এবং বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। নালা-নর্দমার প্রতিরক্ষা দেয়াল ভেঙে পড়েছে। এসব অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু না করলে যান চলাচল আরও বিঘ্নিত হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, দোকান ও রেস্টুরেন্টে পানি ঢুকে অন্তত ১৫ কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। রান্না করা খাবার বিক্রি করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক রেস্টুরেন্ট সরাসরি লোকসানে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। একই শহরে একাধিক সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করায় সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন—সব কার্যক্রম একসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে না হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের খাল, ড্রেন, জলাধার এবং নদীর প্রবাহ একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ। এর কোনো একটি অংশে বাধা সৃষ্টি হলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। বর্তমানে খালের সংখ্যা অনুযায়ী প্রকল্প না নেওয়া, জলাধার সংরক্ষণে অবহেলা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।
এবারের জলাবদ্ধতায় আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে—খাল সংস্কারের জন্য দেওয়া অস্থায়ী বাঁধ সময়মতো অপসারণ না করা। ফলে পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারেনি। একই সঙ্গে খাল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে আলাদা আলাদা প্রকল্প নয়, বরং একক ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি কার্যকর সিটি গভর্নেন্স ব্যবস্থা চালু করা গেলে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হতে পারে।

