দেশে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে। প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ দেড় টাকার মতো মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে, যা আগামী মাসগুলোতে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এ পাঠানো প্রস্তাব অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইভাবে খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ব্যবহারভেদে ভিন্ন ভিন্ন হারে মূল্য সমন্বয় করা হবে। তুলনামূলকভাবে স্বল্প ব্যবহারকারী বা লাইফলাইন গ্রাহকদের ওপর সরাসরি চাপ না পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বেশি পড়বে।
নিয়ম অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব জমা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানি নতুন মূল্য কাঠামোর প্রস্তাব চূড়ান্ত করছে। প্রস্তাব অনুমোদন পেলে গণশুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান এবং ভর্তুকির চাপ কমাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে প্রায় দেড় টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। মধ্যম ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হতে পারে। তবে স্বল্প ব্যবহারকারীরা আপাতত এই বাড়তি দামের বাইরে থাকতে পারেন।
বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ সরাসরি এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায় পড়তে পারে। বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পণ্যের দামেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ও বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ব্যয় গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া দামের তুলনায় কয়েক টাকা বেশি। ফলে ঘাটতি পূরণে ভর্তুকি নির্ভরতা বাড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, কয়লা ও তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি চালু না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হচ্ছে, যা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের খুচরা ও পাইকারি দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন থেকেই ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কিছুটা কমলেও সাধারণ ভোক্তা ও শিল্প খাতে ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

