আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার সঙ্গে চলমান কর্মসূচিতে জট কাটেনি, এর মধ্যেই নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে দেশে অর্থনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ঋণ চাওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে—এতে জনজীবনের চাপ কমবে, নাকি আরও বাড়বে।
সরকারি পর্যায়ের ইঙ্গিত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক-এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে নতুন ঋণের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনায় অগ্রগতি হলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন আগের ঋণ কর্মসূচির কিস্তি পাওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়েছে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ঋণ কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী কিস্তির অর্থ এখনও ছাড় হয়নি। ফলে বিদ্যমান কর্মসূচির অগ্রগতি না হওয়া অবস্থায় নতুন ঋণ চাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এই চাপ সামাল দিতেই অতিরিক্ত বৈদেশিক অর্থের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকার বিকল্প উৎস হিসেবে বহুপাক্ষিক ঋণের দিকে ঝুঁকছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ মানেই নতুন শর্ত। সাধারণত এই ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমানো, কর কাঠামো সংস্কার, ব্যাংক খাতের পরিবর্তন এবং রাজস্ব বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়। এসব নীতির বাস্তবায়ন হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কিংবা করের বোঝা বাড়ার মাধ্যমে জনজীবনে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, ঋণ না নিলে রিজার্ভ থেকে ব্যয় বাড়াতে হতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান দুর্বল করে দিতে পারে। এতে আমদানি ব্যয়, মুদ্রার বিনিময় হার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে—যার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, নতুন ঋণ নেওয়ার আগে বিদ্যমান কর্মসূচির শর্ত পূরণ এবং সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি দেখানো জরুরি। বিশেষ করে ব্যাংক খাত, কর ব্যবস্থা এবং জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে ধারাবাহিকতা না থাকলে ঋণদাতা সংস্থাগুলো কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
সার্বিকভাবে পরিস্থিতি বলছে, নতুন ঋণ স্বল্পমেয়াদে কিছু চাপ কমাতে সাহায্য করলেও এর সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো দীর্ঘমেয়াদে জনজীবনে বাড়তি বোঝা তৈরি করতে পারে। ফলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে শুধু ঋণ নেওয়া নয়, বরং সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার ও নীতিগত সংস্কারই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

