দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল তদারকি ও সুশাসনের অভাব এখন বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাত, যা একসময় সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন বহুমাত্রিক সংকটের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর সংস্কার না হলে ব্যাংক খাতের সংকট সামগ্রিক অর্থনীতিকেও আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়: প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং খাত, জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন। ‘ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন এ আয়োজন করে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বছরের পর বছর রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, করপোরেট গোষ্ঠীর প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল ভূমিকার কারণে ব্যাংকিং খাতের ভিত নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিশেষ করে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে অস্বাভাবিক ঋণ বিতরণ ও অনিয়মের কারণে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কারণে সংকট তৈরি হয়েছে, তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ করে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তিনি ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
তার ভাষায়, ব্যাংক খাতে এখন শুধু আর্থিক নয়, নৈতিক সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক আমানতকারী নিজেদের সঞ্চিত অর্থ তুলতে পারছেন না, যা মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও স্বাধীন ও কার্যকর হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত না হলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ নীরবে আর্থিক চাপ বহন করছে। তার মতে, বিদ্যমান সংকটকে সংস্কারের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে, নয়তো পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাত অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাতে দুর্নীতি ও লুটপাট হলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংক দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেসব তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে, তা দেশের আর্থিক খাতের দুর্বল বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।
তিনি আরও বলেন, বিতর্কিত আইনি ধারা বহাল থাকলে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কারণে ব্যাংকগুলো সংকটে পড়েছে, তারাই আবার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এতে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যাহত হতে পারে।
ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, ব্যাংকিং খাতকে টেকসইভাবে পুনর্গঠন করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও লুটপাটের ফলে যে বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ তৈরি হয়েছে, সেগুলো আলাদা করে হিসাবায়ন ও ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র সামনে আনতে হবে।
ব্যবসায়ী নেতা আবুল কাসেম হায়দার বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হলে শিল্প-বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে যায় এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই শুধু ব্যাংক নয়, পুরো অর্থনীতির স্বার্থেই দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিং খাত একসময় সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপদ ও নৈতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতীক ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ঋণ বিতরণ, করপোরেট প্রভাব এবং দুর্বল তদারকির কারণে সেই আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের মতে, সংকট থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ব্যাংক খাতের চলমান অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

