কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসতেই রাজধানীমুখী হচ্ছেন নীলফামারীর সৈয়দপুরের শতাধিক কসাই। প্রতিবছরের মতো এবারও তাঁদের অনেকে বিমানে করে ঢাকায় আসার প্রস্তুতি নিয়েছেন। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পশু জবাই, মাংস কাটা ও ভাগ করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন তাঁরা। কয়েক দিনের এই মৌসুমি কাজই অনেকের জন্য বছরের বড় আয়ের উৎস হয়ে ওঠে।
সৈয়দপুরের মাংস ব্যবসায়ী ও কসাইদের একটি বড় অংশ বহু প্রজন্ম ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে পশু জবাই, চামড়া অক্ষত রেখে ছাড়ানো, মাংস আলাদা করা এবং নিখুঁতভাবে ভাগ করার দক্ষতার কারণে ঢাকায় তাঁদের আলাদা সুনাম তৈরি হয়েছে। রাজধানীর অনেক পরিবার আগে থেকেই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুকিং দিয়ে রাখেন।
সৈয়দপুরের অভিজ্ঞ কসাই নাদিম কোরাইশি এবার ১০ সদস্যের একটি দল নিয়ে বিমানে ঢাকায় আসছেন। তিনি জানান, তাঁদের পরিবারে কয়েক প্রজন্ম ধরেই কোরবানির সময় ঢাকায় গিয়ে কাজ করার রীতি রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা এই পেশার নানা কৌশল শিখেছেন। তাঁর ভাষায়, কসাইয়ের কাজ শুধু শ্রম নয়, এটি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ধরনের শিল্প।
তিনি বলেন, একটি গরু জবাই থেকে শুরু করে মাংস ভাগ করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিখুঁত কাজের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে শহরের অভিজাত পরিবারগুলো পরিচ্ছন্নতা ও দ্রুত কাজকে গুরুত্ব দেয়। সে কারণেই সৈয়দপুরের কসাইদের প্রতি তাঁদের আস্থা তৈরি হয়েছে।
ঈদের আগে ঢাকাগামী বিমানে যাত্রী তুলনামূলক কম থাকায় অনেক সময় বিমান ভাড়া কমে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেকে এবারও বিমানেই যাত্রার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্থানীয় কয়েকজন কসাই জানান, বাস বা ট্রেনের তুলনায় বিমানে দ্রুত পৌঁছানো যায়, ফলে কাজের সময়ও বেশি পাওয়া যায়।
সৈয়দপুরের আরেক কসাই ফজলে রাব্বি বলেন, ঈদের মৌসুমে ঢাকায় কসাইদের চাহিদা এত বেশি থাকে যে আগেভাগেই অনেক পরিবার বুকিং নিশ্চিত করে রাখে। বিশেষ করে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় তাঁদের আলাদা কদর রয়েছে।
এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। স্থানীয় বাজারে একটি গরু জবাই ও মাংস কাটার জন্য তুলনামূলক কম পারিশ্রমিক পাওয়া গেলেও ঢাকায় একই কাজের জন্য কয়েক গুণ বেশি আয় করা সম্ভব হয়। ফলে পরিবার ছেড়ে ঈদের সময় রাজধানীতে ছুটে যান অনেকে।
কসাই মিন্টু বলেন, ঈদে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছা সবারই থাকে। কিন্তু বাড়তি আয়ের সুযোগ তাঁদের ঢাকামুখী করে তোলে। তাঁর মতে, একজন দক্ষ কসাই ঈদের তিন দিনে একাধিক গরুর কাজ শেষ করতে পারেন। এতে স্বল্প সময়েই ভালো আয় হয়।
সৈয়দপুরের অনেক কসাইয়ের সঙ্গে ঢাকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বছরের পর বছর একই বাসা বা অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দেন গ্রাহকেরা।
স্থানীয় কসাই মোস্তাকিম জানান, আগে তাঁর বাবা ঢাকায় গিয়ে কাজ করতেন। এখন তিনি সেই পরিচিত পরিবারগুলোর ডাকেই রাজধানীতে যান। তাঁদের থাকার জন্য অনেক সময় অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজ বা খালি কক্ষ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
ঈদ শেষ হলে আবারও পুরোনো কর্মজীবনে ফিরে যান এসব কসাই। কেউ বাজারে মাংস বিক্রিতে ব্যস্ত হন, কেউ স্থানীয়ভাবে জবাইয়ের কাজ করেন। তবে কোরবানির ঈদ এলেই তাঁদের জীবনে শুরু হয় ভিন্ন এক ব্যস্ততা, যা সৈয়দপুর থেকে ঢাকার সঙ্গে বহু বছরের এক বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করেছে।

