ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। কিন্তু এর আগেই বিশাল অঙ্কের বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ এসে পড়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ওপর। আগামী মাস থেকেই শুরু হচ্ছে ঋণের কিস্তি পরিশোধ, আর প্রথম বছরেই গুনতে হবে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
বিমানবন্দর প্রকল্পটি ঘিরে এটি এখন বড় আর্থিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। কারণ, যে টার্মিনাল থেকে ভবিষ্যতে আয় হওয়ার কথা, সেটি থেকেই এখনো কোনো কার্যকর রাজস্ব আসছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হতে ২০২৭ সাল পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হতে পারে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে নেওয়া প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার জাপানি ঋণের কিস্তি আগামী জুন থেকে পরিশোধ শুরু হবে। প্রথম ধাপে জুনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং বছরের শেষ দিকে আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ প্রথম বছরেই প্রায় পুরো বার্ষিক উদ্বৃত্ত ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়ে যাবে।
কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই চাপ সামাল দিতে গিয়ে বেবিচককে নিজেদের সঞ্চিত তহবিলে হাত দিতে হতে পারে। এতে দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরের উন্নয়ন, নিরাপত্তা আধুনিকায়ন, নেভিগেশন ব্যবস্থা ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কেনার মতো জরুরি কাজ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মূলত ২০২৩ সাল থেকেই ঋণের কিস্তি শুরুর কথা ছিল। তবে তিন বছরের স্থগিত সুবিধা পাওয়ায় এখন পর্যন্ত চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। সেই সময়সীমা আগামী মাসে শেষ হচ্ছে।
তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও এর ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এই জটের কারণেই টার্মিনাল চালুতে দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে।
প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনায় রয়েছে জাপানের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত একটি কনসোরটিয়াম। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, টার্মিনাল পরিচালনা, আয়ের অংশীদারত্ব ও অপারেশনাল কাঠামো নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনায় দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
বিমান চলাচল খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ব্যবস্থাপনা চুক্তি চূড়ান্ত করা উচিত ছিল। তাহলে টার্মিনাল চালুর সঙ্গে সঙ্গে আয় শুরু করা যেত এবং সেই অর্থ দিয়েই ঋণের চাপ অনেকটা সামাল দেওয়া সম্ভব হতো।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তি হলেও তাৎক্ষণিকভাবে আয় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, চুক্তির পর বিমানবন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর আগে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দীর্ঘ পরীক্ষামূলক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। এতে আরও কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের এই আর্থিক চাপ দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে ঋণ-জিডিপি অনুপাতও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে জাপানি ঋণের বড় অংশ ইয়েনে হওয়ায় টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রকৃত ঋণ ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সময়মতো রাজস্ব আয় নিশ্চিত করা। অনেক প্রকল্পে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হচ্ছে, যা সরকারি সংস্থাগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তৃতীয় টার্মিনালটি চালু হলে দেশের বিমান পরিবহন সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বাড়বে। পাশাপাশি কার্গো পরিবহন ব্যবস্থাও উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হবে।
টার্মিনালটিতে আধুনিক চেক-ইন কাউন্টার, উন্নত ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির পূর্ণ সুফল পেতে এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে সরকার ও যাত্রীদের।

