বাংলাদেশে কর্মরত নারী গণমাধ্যমকর্মীরা পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে প্রায় ছয় গুণ বেশি—এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে একটি নতুন আন্তর্জাতিক গবেষণায়। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ ভুক্তভোগী ঘটনাগুলো প্রকাশই করেন না, ফলে সমস্যাটি প্রায়ই আড়ালেই থেকে যায়।
২১টি দেশের ২ হাজার ৮০০-এর বেশি মিডিয়া পেশাজীবীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় বাংলাদেশের ৩৩৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেন। ফলাফলে দেখা যায়, নারী অংশগ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ মৌখিক যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যেখানে পুরুষদের মধ্যে এ হার মাত্র ৯ শতাংশ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে নারীদের মধ্যে ১৭ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে সরাসরি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনলাইনে হয়রানির হারও উদ্বেগজনক—৪৮ শতাংশ নারী কর্মী এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ১৫ শতাংশ।
শারীরিক হয়রানির ক্ষেত্রেও নারীরা বেশি ঝুঁকিতে আছেন। গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় এক চতুর্থাংশ নারী সাংবাদিক কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক যৌন হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন।
তবে সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো অভিযোগ না করা। ভুক্তভোগীদের অর্ধেকেরও বেশি ঘটনাটি কর্তৃপক্ষকে জানান না। যারা অভিযোগ করেন, তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়, চাকরি হারানোর আশঙ্কা এবং সামাজিক চাপের কারণে অধিকাংশ নারী সাংবাদিক অভিযোগ করতে সাহস পান না, ফলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে যৌন হয়রানির সামগ্রিক হার ১৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় কিছুটা কম হলেও সমস্যা এখনো গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে এই হার ২৯ শতাংশ বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গণমাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত মানের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণা সংশ্লিষ্টরা জোর দিয়ে বলেছেন, অভিযোগ গ্রহণে কার্যকর ব্যবস্থা, কঠোর শূন্য-সহনশীলতা নীতি এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামো না থাকলে এই সমস্যা কমানো কঠিন হবে।
মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সময় এসেছে শুধু নীতিমালা নয়, বাস্তব প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার—যাতে কর্মক্ষেত্রে নারীরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন এবং ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন।

