আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের মহাসড়কজুড়ে বাড়ছে যাত্রীচাপ, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে দীর্ঘ যানজট ও দুর্ভোগের আশঙ্কা। রাজধানী ঢাকার প্রবেশ ও বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ চারটি পয়েন্টসহ দেশের সাতটি প্রধান জাতীয় মহাসড়কে মোট ৯৪টি ঝুঁকিপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সংস্কার ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা না নিলে এবারের ঈদযাত্রা বড় ভোগান্তিতে পরিণত হতে পারে।
পুলিশের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান সড়ক নির্মাণকাজ, বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা, সড়কের খানাখন্দ এবং পশুবাহী ট্রাকের চাপ—সব মিলিয়ে মহাসড়ক পরিস্থিতি ইতোমধ্যে নাজুক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং এশিয়ান হাইওয়ের বিভিন্ন অংশে এখন থেকেই ধীরগতির যান চলাচল দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাইপাইল, কাঞ্চন সেতুর সংযোগ সড়ক, কাঁচপুরের যাত্রামোড়া এলাকা এবং টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা অংশ। এসব জায়গায় চলমান ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে ও চার লেন প্রকল্পের কাজের কারণে সড়ক সরু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানিতে বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় যানবাহনের গতি কমে এসেছে।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে। এছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে ৮টি এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৭টি করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, ভুলতা, রূপসী ও যাত্রামোড়া এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় যানজট লেগেই থাকছে। বৃষ্টির কারণে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। যাত্রীরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে কয়েক মিনিটে যানবাহন পাওয়া যেত, এখন সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সাভারের ঢাকা-আশুলিয়া সড়কেও একই চিত্র। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ও জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে ৪৫ মিনিটে যাতায়াত করা যেত, এখন সময় লাগছে দুই ঘণ্টারও বেশি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের আগে কিছু অংশ খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে পুরো কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে।
টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা এলাকাকে এবারের ঈদযাত্রার অন্যতম বড় ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। যমুনা সেতুর সংযোগ সড়কের কাছে ফ্লাইওভারের অসমাপ্ত কাজের কারণে এখানে যানজটের আশঙ্কা বেশি। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও ঈদের সময় সেই চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে সরাইল বিশ্বরোড পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশেও দীর্ঘ যানজটের শঙ্কা রয়েছে। চার লেন প্রকল্পের ধীরগতির কাজ, অপরিকল্পিত যানবাহন পার্কিং, অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। চালকদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এই অংশ পার হতে অনেক সময় তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়।
হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ টোলপ্লাজা, সেতুর সংযোগ সড়ক ও নির্মাণাধীন এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য, মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্স, রেকার ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হবে। তবে জনবল ও যানবাহনের ঘাটতির কথাও স্বীকার করেছেন কর্মকর্তারা। বর্তমানে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার সড়ক তদারকিতে হাইওয়ে পুলিশের সদস্য সংখ্যা মাত্র তিন হাজারের কিছু বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করতে হলে শুধু অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করলেই হবে না; দ্রুত সড়ক সংস্কার, নির্মাণকাজ সাময়িক নিয়ন্ত্রণ, পশুর হাট ব্যবস্থাপনা এবং মহাসড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি। তা না হলে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।

