দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টা ১০ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আরও মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
কারামুক্তির পর উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে আইভী বলেন, তিনি চান এমন একটি সরকার গড়ে উঠুক যেখানে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে তিনি কারাগারে থাকা অন্যান্য নারী বন্দিদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে অনেক মা ও নারী রয়েছেন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন। তাদের বিষয়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আইভীর মুক্তি আসে একাধিক মামলায় আদালতের দেওয়া জামিন বহাল থাকার পর। সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। কারাগার কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
তার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মোট ১২টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার অধিকাংশই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়েছিল। গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং তিনি কারাগারে থাকেন।
আইনি লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় প্রথমে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি মামলায় ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ সেই জামিন স্থগিতের আবেদন করলে ১৭ মে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আবেদনটি গ্রহণ না করে পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এর আগে ১০ মে আরও ১০টি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনও আপিল বিভাগ বহাল রাখে। ফলে সব মিলিয়ে ১২টি মামলায় জামিন কার্যকর হওয়ার পথ সুগম হয়।
আইভীর মুক্তিকে শুধু একটি আইনি ঘটনা হিসেবে নয়, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ও আলোচিত একটি নাম। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তার ভূমিকা এবং জনপ্রিয়তা তাকে জাতীয় পর্যায়েও পরিচিত করে তুলেছিল।
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিরল এক রেকর্ড গড়েন। তার রাজনৈতিক জীবন নানা চ্যালেঞ্জ, বিতর্ক ও সাফল্যের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইভীর মুক্তি শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর কারাগার থেকে বের হওয়া নয়; এটি দেশের চলমান রাজনৈতিক ও বিচারিক বাস্তবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। আগামী দিনে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে কী ভূমিকা রাখবেন এবং তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।

