বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের প্রধান প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বড় দুর্নীতির অভিযোগে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারা, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং জনআস্থার সংকট—এসব সমালোচনা নতুন নয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুদককে ঘিরে সংস্কারের আলোচনা নতুন করে সামনে আসে।
সংস্কার উদ্যোগ ও অধ্যাদেশের পরিণতি:
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে দুদকের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়াতে আইন সংশোধন করা হয়েছিল। সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে একটি নতুন অধ্যাদেশও জারি করা হয়।
কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই অধ্যাদেশ উপস্থাপন না হওয়ায় তা কার্যকারিতা হারায়। ফলে দুদক আবার ফিরে যায় ২০০৪ সালের মূল আইনি কাঠামোয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংস্কার প্রক্রিয়া থেমে যায়নি; বরং বিষয়টি আরও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে গত ৩ মার্চ মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর দুদক নতুন সংকটে পড়ে। তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও নতুন কমিশন গঠন হয়নি। ফলে অনুসন্ধান, তদন্ত ও কিছু প্রশাসনিক কাজ চললেও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যত স্থবির হয়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠার পর চতুর্থবারের মতো এমন নেতৃত্বশূন্য ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পড়েছে দুদক।
রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দুদক পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে আসে। দুর্নীতিবিরোধী ও সুশাসনকর্মীদের মতে, সমস্যার মূল শুধু আইন বা জনবল নয়; এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব গভীরভাবে যুক্ত। তাদের মতে, জনমনে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে দুদক সমানভাবে সক্রিয় নয়। ফলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনআস্থা পুনরুদ্ধার।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ:
রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গঠিত দুদক সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের প্রধান ছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে মোট ৪৭টি সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- দুদককে বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা
- কমিশনার সংখ্যা তিন থেকে পাঁচে বৃদ্ধি
- অন্তত একজন নারী কমিশনার অন্তর্ভুক্তি
- বিচারিক ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের কমিশনে অন্তর্ভুক্তি
- কমিশনার নিয়োগে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া
- তদন্ত ও প্রসিকিউশন ইউনিট শক্তিশালী করা
- অর্থপাচার ও আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি
- রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কমিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা
সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জারি করা অধ্যাদেশ শুরু থেকেই বিতর্কে পড়ে। আইনজীবী, সাবেক আমলা ও সুশীল সমাজের একাংশের মতে, কিছু ধারা দুদকের স্বাধীনতা বাড়ানোর বদলে নতুন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট ছিল না।
এই বিতর্কের মধ্যেই সংসদে অধ্যাদেশ উপস্থাপন না হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি। ফলে পুরোনো আইন অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে আবারও পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা ফিরে আসে এবং কমিশনের কিছু প্রত্যক্ষ ক্ষমতা সীমিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াই দ্রুত আইন পরিবর্তনের চেষ্টা এই বিতর্কের অন্যতম কারণ।
স্বাধীনতা বনাম জবাবদিহি বিতর্ক:
দুদক সংস্কার নিয়ে মূল বিতর্ক এখন স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ভারসাম্য নিয়ে। এক পক্ষ মনে করে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে দুদক কার্যকর হবে না। অন্য পক্ষের মতে, অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানই জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।
দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদক বর্তমানে একটি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। এটিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীন ও কার্যকর হোক। তবে স্বাধীনতারও একটি সীমা থাকতে হবে।”
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শুধু আইন পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। তদন্ত কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন ব্যবস্থা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া যদি আগের মতো থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।” তার মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ জনবল এবং বিচারিক দীর্ঘসূত্রতাও বড় বাধা।
নতুন করে সংস্কার উদ্যোগ: অধ্যাদেশ বাতিলের পর সরকার আবারও সংশোধিত প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। এবার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—
- কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো
- অর্থপাচার তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধি
- বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট গঠন
- প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান ব্যবস্থা
- তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো
দুদক সংস্কার এখনো চূড়ান্ত কোনো অবস্থায় পৌঁছায়নি। আইন সংশোধন, রাজনৈতিক মতামত, নাগরিক সমাজের পরামর্শ এবং বাস্তবায়ন কৌশল—সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি চলমান।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে বিশ্বাসযোগ্য করতে শুধু নতুন আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বাধীন, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং জনআস্থাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান। এখন প্রশ্ন হলো—এই দীর্ঘ আলোচনার ফল বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে, নাকি দুদক আবারও পুরোনো অনিশ্চয়তার বৃত্তেই আটকে থাকবে।
যা বললেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান:
দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন ও দুর্নীতিবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে আরও কার্যকর করতে দুদকের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফায় দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কী কর্মপরিকল্পনা হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা এসব বিষয়ে একমত হয়েছেন এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংসদে তোলা না হওয়া বা বাতিল হওয়া বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে তিনি জানান। তার ভাষায়, “অধ্যাদেশের বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। দুদকের সামগ্রিক সংস্কার ও কার্যকারিতা নিয়েই কথা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারেরই স্পষ্ট অবস্থান দেওয়া প্রয়োজন।

