দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে চলতি বছরে রোগটিতে মৃতের মোট সংখ্যা বেড়ে ৬৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নতুন করে প্রায় এক হাজার শিশু ও রোগী হামের মতো লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনে জানানো হয়, গতকাল সকাল ৮টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৪৫ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ৯৪ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হাম সংক্রমণে ৯২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি এবং অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে আরও ৫৪৭ শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন—উভয় শ্রেণি মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা ৬৩৯-এ পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান দেশের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। কারণ, হাম সাধারণত প্রতিরোধযোগ্য রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব হলে মৃত্যুঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপাত্তে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত সময়ে সারা দেশে পরীক্ষাগারে মোট ৯ হাজার ৯২৭ জনের শরীরে হাম ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, কারণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক রোগী পরীক্ষার আওতায় আসেন না।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশে মোট ৮২ হাজার ২৯ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৬ হাজার ৯৯৯ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে এখনও হাজার হাজার রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা, পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ, ভিটামিন-এ প্রদান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। তারা সতর্ক করে বলেছেন, সংক্রমণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী সপ্তাহগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি, বাড়ি বাড়ি সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের উদ্যোগ জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের সচেতনতা এবং সরকারি উদ্যোগ—দুই ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

