রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা নারীর মৃত্যুকে ঘিরে অবহেলার অভিযোগের ঘটনায় প্রশাসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে দায়িত্ব পালনরত সদস্য (যুগ্ম সচিব) এ কে এম আনিসুর রহমানকে তার বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অবিলম্বে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য করা হবে।
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে রাজধানীর মিরপুর এলাকায়। সেখানে একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে তার সন্তানদের পেশাগত পরিচয় সামনে আসার পর বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় উঠে আসে।
জানা গেছে, নুরজাহান বেগমের সন্তানদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। মায়ের দেখভাল ও প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ উঠতেই বিষয়টি প্রশাসনিক ও সামাজিক পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা ও প্রাসঙ্গিক আইনগত দিকগুলো পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশে কার্যকর ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’-এ সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের খাদ্য, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, একাধিক সন্তান থাকলে পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের স্বাস্থ্য ও প্রয়োজনীয় সেবার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে।
আইন অমান্যের ক্ষেত্রে অর্থদণ্ড কিংবা কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। তবে আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া সাধারণত আদালত এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি আমলে নিতে পারে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়; বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল নগরজীবনে বয়স্ক নাগরিকদের নিরাপত্তা, সেবা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও মানসিক সহায়তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পর এখন সবার নজর তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার দিকে। অভিযোগের সত্যতা, দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং বিদ্যমান আইনের আওতায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব—এসব বিষয় পর্যালোচনার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ঘটনাটি ইতোমধ্যে সমাজে প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, বাবা-মায়ের যত্ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সন্তানদের মৌলিক দায়িত্ব, যা কোনো অবস্থাতেই উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়।

