দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে একাধিক বড় উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা উন্নত করা, উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসা শিক্ষার অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে এই বিস্তৃত পরিকল্পনা।
সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবাকেও আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষকে রাজধানীমুখী হতে না হয়।
পাঁচ বিভাগে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
সরকার খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লা বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। শিশুদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।
হাসপাতালগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যেই হাসপাতালগুলো উদ্বোধনের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হবে। পাশাপাশি বড় আকারের নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট স্থাপনের ব্যবস্থাও থাকবে। এসব হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক জনবল প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা হাসপাতালগুলোতে সেবার পরিধি বাড়ছে
দেশের ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে জেলা শহরে রোগীর চাপ কিছুটা কমবে এবং উপজেলা পর্যায়েই মানুষ আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে।
এই সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। পুনর্বাসন চিকিৎসা সহজলভ্য করতে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে একজন পুরুষ ও একজন নারী ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পুনর্বাসনসেবা সীমিত ছিল। নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উপকৃত হবেন।
নারীদের জন্য পাঁচটি এক হাজার শয্যার হাসপাতাল
নারীস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের বড় শহরগুলোতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বিশেষায়িত নারী হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকার আশা করছে, বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে এসব হাসপাতাল নির্মাণ করা সম্ভব হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের মধ্যেই নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে।
মাতৃস্বাস্থ্য, জটিল প্রসূতি চিকিৎসা, স্ত্রীরোগ এবং নারীদের জন্য বিশেষায়িত বিভিন্ন সেবা এক ছাদের নিচে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই হাসপাতালগুলো গড়ে তোলা হবে।
ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ডে নতুন অবকাঠামো
রাজধানীর চিকিৎসা ও চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক হাজার ১০০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থী, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন সুবিধা উন্নত করা হবে।
অন্যদিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকার। অবৈধ দখলমুক্ত করে সেখানে নতুন হাসপাতাল অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া জাতীয় স্নায়ুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নতুন ভবন আগামী ১৫ আগস্ট উদ্বোধনের পর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
সিলেটে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণে আগ্রহ চীনের
সিলেটে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনের বিনিয়োগকারীরা। সম্ভাব্য স্থান হিসেবে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর এলাকা এবং উচ্চপ্রযুক্তি পার্ক পরিদর্শনও করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিলেট অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম
স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জনমুখী করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৬ থেকে ১০টি উপজেলার একটি করে ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে এই কর্মসূচি চালু হবে।
এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগে তথ্য সংগ্রহ করা। সফল হলে ভবিষ্যতে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। তারা তথ্য সংগ্রহ ও মোবাইলভিত্তিক ডিজিটাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ করবেন।
স্বাস্থ্যখাতের নতুন দিগন্ত
সরকারের ঘোষিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল, উপজেলা পর্যায়ে সেবার সম্প্রসারণ এবং ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম দেশের চিকিৎসাসেবাকে আরও সহজলভ্য ও কার্যকর করে তুলবে।
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার যে সমালোচনা ছিল, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে তা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত প্রকল্পগুলো কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায় এবং সাধারণ মানুষ কতটা এর সুফল ভোগ করতে পারে।

