রাজধানীতে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, সংস্থাটির অধিকাংশ ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু বিস্তারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা নগরবাসীর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডজুড়ে পরিচালিত বর্ষাপূর্ব এডিস মশার লার্ভা জরিপে দেখা যায়, মোট ৬৩টি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মান অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ প্রতি চারটি ওয়ার্ডের মধ্যে তিনটিরও বেশি এলাকায় ডেঙ্গু বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার সময় বৃষ্টিপাত বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
নগর ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত এ জরিপে আধুনিক তথ্য সংগ্রহ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১২ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জরিপে দেখা গেছে, পরিদর্শন করা বাড়িগুলোর মধ্যে ২৮১টিতে এডিস মশার লার্ভা অথবা পিউপা পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি লার্ভা শনাক্ত হয়েছে বহুতল ভবনে। মোট শনাক্ত লার্ভার প্রায় ৩৫ শতাংশই পাওয়া গেছে এসব ভবনে। একক আবাসিক বাড়িতে পাওয়া গেছে প্রায় ২৮ শতাংশ। এছাড়া নির্মাণাধীন ভবন ও সেমিপাকা বাড়িতেও উল্লেখযোগ্য হারে মশার প্রজনন চিহ্নিত হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আধুনিক নগরায়নের মধ্যেও বহুতল ভবনগুলো এখন ডেঙ্গুর অন্যতম ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠছে। ছাদে জমে থাকা পানি, অব্যবহৃত টব, জলাধার, নির্মাণসামগ্রী কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মশার প্রজননস্থল পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, ঘর বা ভবনের মেঝেতে জমে থাকা পানিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। এছাড়া বালতি, প্লাস্টিকের ড্রাম এবং বিভিন্ন পাত্রেও বিপুলসংখ্যক প্রজননস্থল শনাক্ত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণ জিনিসপত্রও এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে।
জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। আগামী ৭ জুন থেকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি ওয়ার্ডে পাঁচ দিনের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ সময় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নিবিড় তদারকি চালানো হবে। পরবর্তীতে মাঝারি ঝুঁকিতে থাকা আরও ৩৬টি ওয়ার্ডেও একই ধরনের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৬ জুন রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় সচেতনতামূলক র্যালির আয়োজন করা হবে। পর্যায়ক্রমে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বাসাবাড়ি, অফিস ও আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি তিন দিন পরপর জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ওষুধ ছিটিয়ে সাময়িকভাবে মশা কমানো সম্ভব হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন উৎসস্থল নির্মূল। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দক্ষিণ ঢাকার অধিকাংশ ওয়ার্ডে উচ্চমাত্রার এডিস উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের বছরের তুলনায় আরও বাড়তে পারে।

