বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে বিদ্যমান কর ও শুল্ক কাঠামো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাত এখনও নীতিগত ও রাজস্বগত বৈষম্যের শিকার। এ অবস্থায় আগামী জাতীয় বাজেটে একটি সুস্পষ্ট ‘সবুজ রাজস্ব নীতি’ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ দাবি তুলে ধরা হয়। ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি খাত মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এই খাতকে ঘিরে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব ও লবিংয়ের কারণে কর ও শুল্ক নীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রসার প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না।
সিপিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে সবুজ অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য দেওয়া কর-সুবিধা ও ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে সবুজ বাজেট ও পরিবেশবান্ধব করব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও সেই ধরনের রাজস্ব সংস্কার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
বক্তারা বলেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি হলেও করনীতির কারণে সেই খাত পর্যাপ্ত উৎসাহ পাচ্ছে না।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ খাতের কিছু উপাদানের ওপর শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো এখনও উচ্চ করের আওতায় রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থার বিভিন্ন সরঞ্জামের ওপর তুলনামূলক বেশি শুল্ক বহাল আছে। অন্যদিকে এলএনজিসহ বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে অপেক্ষাকৃত কম শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
সিপিডির মতে, এই বৈষম্যমূলক রাজস্ব কাঠামো দেশের জন্য দ্বৈত ক্ষতির কারণ হচ্ছে। একদিকে কর-সুবিধার কারণে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি পরিবর্তনে আগামী বাজেট থেকেই সবুজ রাজস্ব নীতি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, গ্রিড অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর কর ও শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিশেষ কর-সুবিধা পুনর্বিবেচনা করে ধীরে ধীরে তা প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদসহ সংস্থাটির অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মতে, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাজেট ও রাজস্ব নীতিকে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

