ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে মর্গের সামনে তখন সন্ধ্যা নেমে আসছে। চারপাশে হঠাৎ ভেসে আসছে কান্নার রোল। ভেতরে পাশাপাশি দুটি শিশুর নিথর দেহ পড়ে আছে। এই দৃশ্য যেন পুরো হাসপাতালকে এক নীরব শোকের চাদরে ঢেকে দেয়।
একটি স্ট্রেচারে শুয়ে আছে গোলাপি ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়ে। নাকে সাদা ব্যান্ডেজ। আধখোলা চোখ যেন এখনো ঘুমিয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে মা সন্তানকে জড়িয়ে ধরে ভেঙে পড়ছেন। বারবার শুধু বিলাপ—এমন দৃশ্য কোনো মায়ের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, “হায়রে ব্যাটারি রিকশাওয়ালা যমদূত, আমার আদরের মাইয়াডারে কাইড়া নিলি।”
অন্য পাশে জানালার গ্রিল ধরে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আরেক বাবা। তাঁর মেয়ের নিথর দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। যেন ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট জান্নাতি। এই দৃশ্য হাসপাতালের প্রতিটি মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। গত ৬ মে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় দুই শিশু—কামরাঙ্গীরচরের জান্নাতি এবং কদমতলীর সুমাইয়া নূর তাকওয়া। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি প্রাণ থেমে যায় সড়কের সংঘর্ষে।
কদমতলীতে আট বছরের সুমাইয়া নানির সঙ্গে হাঁটার সময় ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর কিছুক্ষণ চিকিৎসা চললেও তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে কামরাঙ্গীরচরের পাঁচ বছরের জান্নাতি বাড়ির পাশে খেলছিল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা তাকে ধাক্কা দেয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিশুটির স্বজন জানান, মামলা করতে হলে মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রয়োজন হতো। কিন্তু তারা শিশুর শরীর কাটাছেঁড়া চাননি। পাশাপাশি চালককে গরিব ও বয়স্ক বিবেচনা করে পরিবার বিষয়টি এগিয়ে নেয়নি।
ঢাকার সড়কে এখন চুরি, ছিনতাই কিংবা যানজটের পাশাপাশি নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। ৭০ বছর বয়সী হেলালুজ্জামান কবির বলেন, “এই রিকশা দেখলেই ভয় লাগে। তুফানের বেগে চালায়। স্পিড ব্রেকারেও গতি কমায় না। তিন মাস আগে পড়ে গিয়ে এখনো কোমর ব্যথা আছে।” মিরপুরের গার্মেন্টস শ্রমিক ফারহানা আক্তার জানান, মার্চ মাসে কারখানা থেকে ফেরার পথে রিকশা নিয়ন্ত্রণ হারালে তিনি ছিটকে পড়েন। অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ান। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন বলেন, গলির ভেতর এই রিকশাগুলো দ্রুতগতিতে চলে, প্রতিদিনই আতঙ্ক নিয়ে চলতে হয়।
২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন নেই। এর ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং প্যাডেল রিকশার ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশই অনিবন্ধিত। গবেষণায় দেখা যায়, ৭৫ শতাংশ চালকের রিকশা চালানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ৮২ শতাংশ যাত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন গতি ও সহজলভ্যতার কারণে। তবে ৩০ শতাংশ যাত্রী স্বীকার করেন, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোস্তাক আহমেদ বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা ও অভ্যন্তরীণ আঘাত প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ও পথচারী দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কেনান বলেন, এটি এখন শুধু ট্রাফিক সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। অনেক রোগী স্থায়ী অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন চাকার যানবাহন সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৬ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনে আরও ৪৮৯ জন নিহত হন। ২০২৫ সালে শুধু ঢাকাতেই ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত এবং ৫১১ জন আহত হন। গবেষণায় আরও বলা হয়, ঢাকার দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি নিহত হন পথচারী (৪৭.০৩ শতাংশ), এরপর মোটরসাইকেল আরোহী (৪৩.৩৭ শতাংশ)।
কেন ঘটছে এসব দুর্ঘটনা:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশার কাঠামোগত দুর্বলতা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। গবেষণায় যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে—
- দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম
- উচ্চগতির জন্য অনুপযোগী কাঠামো
- ভারসাম্যহীন ডিজাইন ও সরু চাকা
- নিম্নমানের ব্যাটারি ও ত্রুটিপূর্ণ ওয়্যারিং
- প্রশিক্ষণহীন চালক
- ট্রাফিক আইন না জানা
- অতিরিক্ত যাত্রী বহন
- অনিবন্ধিত গ্যারেজে তৈরি যান
- রাস্তার গর্ত ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা
- মিশ্র ট্রাফিকের গতি অসামঞ্জস্য
বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এহসান বলেন, মূল রিকশার কাঠামো মোটরের জন্য তৈরি নয়। এতে যান্ত্রিক ভার ও গতি বাড়ায় ঝুঁকি বহুগুণ। সিপিডির গবেষণা সহকারী মো. খালিদ মাহমুদ বলেন, প্রধান সড়কের যানবাহনের সঙ্গে এই রিকশার গতির সামঞ্জস্য নেই, যা স্পিড মিসম্যাচ তৈরি করছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৮টি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডাম্পিং, ব্যাটারি ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ রয়েছে ৩ হাজার ৫১৮টি। তবুও রাস্তায় এসব রিকশার সংখ্যা কমেনি। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নগর অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। এটি কর্মসংস্থানও তৈরি করছে। তবে তিনি মনে করেন, নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সিং ছাড়া এটি ঝুঁকিপূর্ণ। নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, এটি শুধু পরিবহন সমস্যা নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের সংকট। নীতিগত দুর্বলতা ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
প্রস্তাবিত ‘ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা–২০২৫’-এ লাইসেন্স, সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিসীমা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক চলাচলের কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন এখনো সীমিত। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল নিবন্ধন ও সমন্বিত মনিটরিং ছাড়া এই সংকট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
জান্নাতি, সুমাইয়া, রাচির মতো অসংখ্য মৃত্যু এখন ঢাকার সড়কের বাস্তব চিত্র। প্রযুক্তির বিস্তার বাড়লেও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পিছিয়ে আছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আর কত প্রাণ হারালে এই নীরব বিপর্যয় থামবে?

