অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল)-এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দেশের ইতিহাসে কোনো বেসরকারি ব্যাংকে দীর্ঘতম সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড রয়েছে তার। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিও আগে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ শোনা গেলেও এবারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।
দুদকের চলমান অনুসন্ধানে পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। সেই তদন্তের এক পর্যায়ে আলী রেজা ইফতেখারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ওই তথ্যের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধেও পৃথকভাবে অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি।
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত মাসে ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে ছয় ধরনের নথিপত্র চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে আলী রেজা ইফতেখারের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বরসহ বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতার পূর্ণ হিসাব, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক হিসাবের তথ্য এবং অবসরকালীন সুবিধাসহ সব আর্থিক লেনদেনের নথি চাওয়া হয়।
নথি জমা দেওয়ার জন্য ১৭ মে পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক তা দিতে ব্যর্থ হয়। পরে গত ৩ জুন আরও ১০ কর্মদিবস সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সার্বিক বিবেচনায় পরে সাত কর্মদিবস সময় অনুমোদন করে দুদক। সেই অনুযায়ী আগামী ১৪ জুনের মধ্যে সব নথি জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
আলী রেজা ইফতেখার ২০০৪ সালে ইবিএলে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৬ সালে তিনি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ২০০৭ সালে তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি অবসরে যান। দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ইতিহাসে কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক এত দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ছিলেন না। দায়িত্বকালে তাকে অন্তত পাঁচবার পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়।
তিনি ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডে সিইও অব দ্য ইয়ার ২০১২ হিসেবে সম্মানিত হন। এছাড়া ২০২০-২১ এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
এদিকে, ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জানুয়ারিতে তাদের ২২টি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদ্মা ব্যাংকের (পূর্বে ফারমার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাফিজ সরাফত। এরপর ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়। এর মধ্যে একটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং কয়েকটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

