বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অনিয়ম এবং ব্যয়বহুল চুক্তির প্রভাব এখনো বহন করছে বাংলাদেশ। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এ খাতের আর্থিক চাপ সামাল দিতে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, অতীতের নানা সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় ও উৎপাদন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের অদক্ষতা এবং অনিয়মের কারণে জনগণের অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর নামে অতীতে এমন অনেক প্রকল্প ও চুক্তি করা হয়েছে, যেগুলোর আর্থিক শর্ত দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ ব্যবস্থার কারণে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে, যদিও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতার পুরো সুবিধা জনগণ পায়নি। ফলে রাষ্ট্রকে একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যয় বহন করতে হয়েছে, অন্যদিকে ভর্তুকির পরিমাণও ক্রমাগত বেড়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুশাসনের ঘাটতি এবং পরিকল্পনার অসামঞ্জস্যতার কারণে উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। এর মধ্যে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ এবং জাতীয় গ্রিডভুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও এখনো দেশের সব এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী ব্যয় এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পায় না। বরং উচ্চ ব্যয়ের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ভর্তুকি এবং জনগণের করের অর্থের মাধ্যমে বহন করতে হয়।
এদিকে নতুন অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছে, যা দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট। এই বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারের আশা, অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে আগামী বছরগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয়ও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ হলো, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ কমাতে শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, বরং বিদ্যমান চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, অপচয় রোধ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় ভর্তুকির এই বড় অঙ্ক ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

