বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধা প্রদানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছে সরকার। শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে প্রতি বছর প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের পাওনা অর্থ পরিশোধে। ফলে হাজার হাজার আবেদন দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
রবিবার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে কল্যাণ ট্রাস্টের বার্ষিক আয় প্রায় ৬৮৪ কোটি টাকা হলেও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধা দিতে বছরে প্রয়োজন হয় প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের এই বৈষম্যের কারণেই প্রতিবছর বড় অঙ্কের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ট্রাস্টের প্রধান আয়ের উৎস হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের একটি নির্ধারিত অংশ এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় কল্যাণ সুবিধার দায়ও দ্রুত বাড়ছে। ফলে বিদ্যমান আয়ের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে এককালীন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি শিক্ষা খাতের শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরের পর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য কল্যাণ ট্রাস্টের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও অর্থসংকটের কারণে অনেকেই অবসরের পর বছরের পর বছর প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় থাকেন। এতে তাদের পারিবারিক ও আর্থিক জীবনে চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যয়, সংসার পরিচালনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণে অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সমস্যার মুখোমুখি হন।
মন্ত্রী সংসদকে জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ২৮৪ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে ৫৫৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বেশি কল্যাণ সুবিধা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জমা হওয়া সব আবেদন নিষ্পত্তি করে সুবিধাভোগীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হয়েছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জুন ও জুলাই মাসে জমা পড়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে এবং অর্থ ছাড়ের প্রস্তুতি চলছে। তবে বিপুলসংখ্যক অনিষ্পন্ন আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল বিদ্যমান অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই ট্রাস্টের জন্য বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা, সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য সুবিধা প্রদানে জট দীর্ঘতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অনিষ্পন্ন আবেদনগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ হাজার হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী তাদের ন্যায্য প্রাপ্য দ্রুত হাতে পাবেন।

