যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছে সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, এই চুক্তির ফলে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।
বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভর না করে নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্য চুক্তি, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। এছাড়া উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা, দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান বাজারেও বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এর ফলে রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি আরও বহুমুখী ও স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ পাবে।
সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ফল হিসেবে কৃষিপণ্য ও অপ্রচলিত রপ্তানি খাতেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সম্প্রতি ভিয়েতনামের বাজারে বাংলাদেশের আলু রপ্তানির পথ উন্মুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের আম রপ্তানির বিষয়েও কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি শুধু রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে শূন্য শুল্ক সুবিধা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ভূমিকা শক্তিশালী হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

