বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্যে দেশের প্রধান প্রধান রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সড়ক ও রেল অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১৭ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ক্রমবর্ধমান পরিবহন চাহিদা মোকাবিলা এবং টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার রেল খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রধান রুটগুলোতে পর্যায়ক্রমে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও সেই ধারায় যুক্ত হতে চায়। বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে একদিকে যেমন জ্বালানি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণও হ্রাস পাবে। পাশাপাশি যাত্রীসেবা আরও দ্রুত, নিরাপদ এবং আধুনিক হবে।
তিনি জানান, শুধু রেল নয়, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে সড়ক, রেল এবং অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমকে সমন্বিত করে বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত মালবাহী যানবাহনের কারণে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে স্মার্ট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং অক্ষভিত্তিক ওজন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি চালুর কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নিরাপদ করে তুলবে।
রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার সমাধানেও বেশ কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহরের চারপাশে রিং রোড এবং কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে সংযোগ স্থাপনকারী সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে উড়ালসড়ক ও ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে, যা নগর যোগাযোগকে আরও গতিশীল করবে।
দেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এলাকায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেল খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত তিন ধাপে মোট ২৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়েকে জাতীয় পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সব রেলপথকে ধীরে ধীরে দ্বৈত গেজ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে রেল সংযোগ আরও কার্যকর হবে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশের রেল খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ এটি শুধু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার পথই সুগম করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রেলপথকে কেন্দ্র করে সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই দশকে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে আধুনিক রেলব্যবস্থা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

