ঢাকার একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে শুরু হয়েছিল ঘটনাটি। সাত বছরের শিশু রায়ান জ্বরে আক্রান্ত হলে তার বাবা কাছের একটি ফার্মেসি থেকে “শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক” কিনে আনেন। কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধটি শুরু করা হয়। তিন দিনের মধ্যে জ্বর কমে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কিছু মাস পর একই অসুখ আবার ফিরে আসে। কিন্তু এবার আগের সেই ওষুধ আর কাজ করে না। পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে জানা যায়, জীবাণুগুলো ইতিমধ্যেই ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে।
এই ঘটনা শুধু রায়ানের নয়। এটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস্তবতা। ধীরে ধীরে এমন এক পরিস্থিতির দিকে মানবজাতি এগোচ্ছে, যেখানে সাধারণ সংক্রমণ, ছোট অস্ত্রোপচার কিংবা সন্তান জন্মদানও আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, যা বিশেষজ্ঞদের মতে এক ধরনের “নীরব মহামারি”।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কী এবং কেন এটি ভয়াবহ
এই অবস্থায় জীবাণু—যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক—ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে যে ওষুধ আগে সংক্রমণ সারাতে পারত, সেটি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
অ্যান্টিবায়োটিক মূলত মানুষের শরীর নয়, বরং ক্ষতিকর জীবাণুকে লক্ষ্য করে কাজ করে। কিন্তু ভুলভাবে ব্যবহার করলে, যেমন ভাইরাসজনিত সর্দি-জ্বরেও অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ নেওয়া, বা মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া—তখন কিছু জীবাণু বেঁচে যায়। সময়ের সঙ্গে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে “সুপারবাগ”-এ পরিণত হয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই পরিবর্তন চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে হাসপাতাল, ঘরবাড়ি, খাবার, পানি ও পরিবেশে এই প্রতিরোধী জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রায় ১.২৭ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণে মারা গেছে। একই সময়ে প্রায় ৫ মিলিয়ন মৃত্যুর সঙ্গে এই সংকট পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর এক কোটির বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে, যা ক্যান্সারের মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ কেন বেশি ঝুঁকিতে
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক সহজেই পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়। জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়ার মতো সাধারণ সমস্যাতেও অনেক সময় অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ফার্মেসির কর্মীরাই ওষুধ দিয়ে দেন এবং পরামর্শও দেন। ফলে ভুল ব্যবহার আরও বেড়ে যায়।
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মৃত্যু এই প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে ঘটছে। ২০২১ সালে আনুমানিক ৯৬,৯০০ জন মৃত্যুর সঙ্গে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স যুক্ত ছিল, যার মধ্যে প্রায় ২৩,৫০০ জনের মৃত্যু সরাসরি সুপারবাগ সংক্রমণের কারণে।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা ৯০ শতাংশেরও বেশি হয়ে গেছে।
যখন জীবাণু বারবার অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা ধীরে ধীরে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে আগের ওষুধ আর কাজ করে না।
এর প্রধান কারণগুলো হলো—
১. অ্যান্টিবায়োটিকের ভুল ও অতিরিক্ত ব্যবহার
• চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া
• ভাইরাসজনিত জ্বরেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
• কোর্স সম্পূর্ণ না করা
• অন্যের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করা
• অপ্রয়োজনীয়ভাবে ওষুধ দেওয়া
২. সচেতনতার অভাব
অনেকেই জানেন না যে অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। ফলে অপ্রয়োজনে ব্যবহার ভবিষ্যতে চিকিৎসাকে কঠিন করে তোলে।
৩. হাসপাতালের দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ
অনেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত জীবাণুমুক্ত ব্যবস্থা নেই। অতিরিক্ত ভিড়, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জীবাণু ছড়াতে সাহায্য করে।
৪. কৃষি ও প্রাণিসম্পদে অতিরিক্ত ব্যবহার
মুরগি, মাছ ও পশুপালনে দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এসব থেকে প্রতিরোধী জীবাণু খাদ্য ও পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসার জন্য হুমকি
এই প্রবণতা চলতে থাকলে এমন সময় আসতে পারে যখন সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও সম্ভব হবে না। সিজারিয়ান অপারেশন, ক্যান্সার চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন কিংবা নিবিড় পরিচর্যার মতো চিকিৎসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।
কারণ এসব ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর ওষুধ না থাকলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা এখন এক স্বাস্থ্য ধারণার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এই ধারণা অনুযায়ী মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জীবাণু ছড়াতে পারে খাদ্য, পানি, প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশগত বর্জ্যের মাধ্যমে।
তাই শুধু হাসপাতাল নয়, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ—সব খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সাধারণ মানুষের করণীয়
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; জনগণের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগত দায়িত্ব
• চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া
• অপ্রয়োজনে ওষুধ ব্যবহার না করা
• পুরো কোর্স সম্পন্ন করা
• অন্যের ওষুধ ব্যবহার না করা
• বাকি ওষুধ সংরক্ষণ বা পুনঃব্যবহার না করা
সামাজিক পর্যায়
• সচেতনতা বৃদ্ধি করা
• হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
• কৃষিতে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানো
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
• নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা
• হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা
• ওষুধ বিক্রিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ
• পরীক্ষাগার ও নজরদারি উন্নত করা
সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে
একসময় অ্যান্টিবায়োটিককে বলা হতো “মিরাকল ড্রাগ”। কিন্তু সেই আশ্চর্য শক্তি এখন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সাধারণ সংক্রমণ আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে।
শেষ প্রশ্নটি তাই খুব সহজ কিন্তু গভীর—
আমরা কি সময় থাকতে সচেতন হব, নাকি একদিন দেখব—অবহেলা ও ভুল ব্যবহারের কারণে আধুনিক চিকিৎসার শক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে?

