দেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে আসনের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়লেও এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে শিক্ষার্থী ও আসনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বড় হচ্ছে। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়ায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পরও ১৫ লাখের বেশি আসন খালি থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে বেসরকারি, নন-এমপিও এবং মফস্বল এলাকার অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কলেজগুলোতে। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের আয় কমবে। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
এদিকে এবারও এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের মতোই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।
কয়েক বছর আগেও দেশে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে সেই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এবার ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড়ে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩৮ জনই পাস করতে পারেনি।
এর আগে ২০২১ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। এরপর থেকে পাসের হার কমতে থাকে। ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এবার তা আরও প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
অন্যদিকে পাসের হার ঊর্ধ্বমুখী থাকার সময় দেশে কলেজের সংখ্যা ও আসন বাড়ানো হয়েছিল। এখন পাসের হার কমে যাওয়ায় এসব অতিরিক্ত আসন পূরণ করা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নবীন, কম পরিচিত ও তুলনামূলকভাবে দুর্বল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে ২৬ লাখ ৬৬ হাজার। সোমবার প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন।
ফলে পাস করা সব শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এ বছর ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১২৩টি আসন খালি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ মোট আসনের প্রায় ৫৭ শতাংশই পূরণ হবে না। গত বছর সম্ভাব্য খালি আসনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৬৩ হাজার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খালি আসন বাড়তে পারে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের অধীন কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতেও বিপুলসংখ্যক আসন রয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। কুমিল্লায় প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার, রাজশাহীতে ৩ লাখ ৮৬ হাজার, যশোরে ২ লাখ ২০ হাজার, চট্টগ্রামে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার, বরিশালে ১ লাখ ৭০ হাজার, সিলেটে ১ লাখ ৬০ হাজার, দিনাজপুরে ৩ লাখ ৫৭ হাজার এবং ময়মনসিংহে ১ লাখ ৩৫ হাজার আসন রয়েছে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন একাদশ শ্রেণিতে আসন রয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজারের কিছু বেশি।
শিক্ষার্থী ভর্তির সংকটের প্রভাব বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত কলেজগুলোতে বেশি পড়তে পারে বলে মনে করেন রাজধানীর উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মোজাম্মেল হক। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের আয় আসে শিক্ষার্থীদের বেতন, ভর্তি ফি ও অন্যান্য ফি থেকে। ফলে ভর্তি কমে গেলে আয়ও কমে যাবে। এতে নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সংকটে পড়তে হতে পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের সব কলেজে পরিস্থিতি একই রকম হবে না। রাজধানী ও বড় শহরের পরিচিত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের চাপ থাকতে পারে। কিন্তু মফস্বল, উপজেলা এবং অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক বছর ধরেই নির্ধারিত আসনের বড় অংশ খালি থাকছে, তাদের জন্য এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
একটি কলেজে যদি ৫০০ আসনের বিপরীতে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তাহলে শুধু শ্রেণিকক্ষ খালি পড়ে থাকবে না, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কাঠামোর ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। শিক্ষার্থী কমে গেলে ভর্তি ফি ও বেতন থেকে আয় কমে যাওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যাপক আতিয়ার রাহমান মনে করেন, শিক্ষার্থী কম পাস করা বা জিপিএ কমে যাওয়ার কারণে সরকারি কলেজগুলোতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এমপিওভুক্ত কলেজগুলোর আয় কমতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে মানহীন বেসরকারি কলেজগুলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা শিক্ষক-কর্মচারী কমিয়ে পরিচালন ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তবে শিক্ষার্থী সংকটের প্রভাব সব জায়গায় একইভাবে দেখা যাবে না। একই এলাকার একটি নামি কলেজে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, আবার কাছাকাছি অন্য কোনো কম পরিচিত কলেজে অর্ধেক আসনও পূরণ নাও হতে পারে। শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়, শিক্ষার মান, ফলাফল, শিক্ষক উপস্থিতি, অবকাঠামো এবং যাতায়াত ব্যবস্থাও শিক্ষার্থীদের পছন্দের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি শিক্ষার মানের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আকৃষ্ট করতে না পারে এবং একপর্যায়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টিকে সবসময় নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তার মতে, এমন পরিবর্তন শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ইতিবাচকও হতে পারে।

