টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার নয়, বরং পানি, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে একযোগে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর ভাষায়, কেবল ওষুধ, স্যালাইন বা সিরিঞ্জ সরবরাহ করে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, বরং এসডিজির স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রোগ প্রতিরোধের ওপর।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনাবিষয়ক একটি জাতীয় সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা এবং জেন্ডার বৈষম্য হ্রাসের পাশাপাশি এসডিজির তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতকে পানি, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ খাতের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, শুধু ওষুধ বা স্যালাইন সরবরাহ করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়—এর মূল ভিত্তি হতে হবে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
গ্রামাঞ্চলের স্যানিটেশন পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিষয়ে সচেতন করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজারঘাটে অপরিচ্ছন্নভাবে জিনিসপত্র স্পর্শ করার পর একই হাতে টাকা লেনদেনের মতো দৈনন্দিন অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো বদলাতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, উপকূলীয় এলাকায় তীব্র লবণাক্ততা ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে হলুদাভ, দূষিত পানি পান করছেন। গত মাসে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি নিজে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আশ্বাসও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহার এবং জাঙ্ক ফুড ও ফাস্টফুডের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
পরিকল্পনা কমিশনের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে এসডিজি অর্জন করা সম্ভব নয়। বরং পানি, স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। তিনি প্রস্তাব দেন, অন্তত প্রতি দুই মাসে একবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে বৈঠক আয়োজন করে যৌথভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বক্তব্যে তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মায়েদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব এবং সামগ্রিক পুষ্টি নিশ্চিতকরণের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, কোনো একক মন্ত্রণালয়ের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কর্মপদ্ধতি ও যৌথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার একজন সম্মানিত ফেলোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পানিসম্পদ মন্ত্রী, এবং গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের একজন সংসদ সদস্য। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এসডিজির মতো বহুমাত্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খাতভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়ার এই বার্তা সময়োপযোগী, এবং তা বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ আরও মসৃণ হতে পারে।

