বাংলাদেশের প্রস্তাবিত অর্থবছর ২০২৬-২৭ বাজেটে জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বের দাবি রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যখন দিন দিন আরও স্পষ্ট ও কঠিন হয়ে উঠছে, তখন জলবায়ু সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জলবায়ু কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক করা এবং অভিযোজন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি—এসবই ইতিবাচক পদক্ষেপ।
প্রস্তাবিত জলবায়ু বাজেট প্রায় ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এটি বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি। এই বৃদ্ধি দেখায় যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখছে না; বরং উন্নয়ন, কৃষি, পানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অথচ বৈশ্বিক উষ্ণায়নকারী গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ১ শতাংশেরও কম। এই বৈপরীত্যই জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল প্রশ্নকে সামনে আনে। যে দেশ জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, সেই দেশকেই কেন বারবার বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা, তাপপ্রবাহ ও বাস্তুচ্যুতির বোঝা বহন করতে হবে?
এই বাস্তবতায় অভিযোজন খাতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজনীয় এবং যৌক্তিক। প্রস্তাবিত বরাদ্দের প্রায় ৭৫ শতাংশ অভিযোজন কার্যক্রমে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বাঁধ নির্মাণ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো খাত। সংখ্যার দিক থেকে এটি জলবায়ু সংবেদনশীল বাজেটের পরিচয় বহন করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু বরাদ্দ বাড়লেই কি বাজেট ন্যায্য হয়? জলবায়ু বাজেটকে সত্যিকার অর্থে ন্যায্য বলতে হলে শুধু কত টাকা খরচ হচ্ছে তা দেখলেই হবে না। দেখতে হবে, এই অর্থের সুবিধা কারা পাচ্ছে, জলবায়ু অভিযোজনের আসল বোঝা কারা বহন করছে, আর কার শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের জলবায়ু সহনশীলতা তৈরি হচ্ছে।
বরাদ্দ বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় ঘাটতি বড়
প্রথম উদ্বেগ হলো অর্থের পর্যাপ্ততা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয় বলে ধারণা করা হয়, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশের সমান। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু সম্পর্কিত সরকারি ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটেও এই সীমাবদ্ধতা থেকে বের হওয়া যায়নি।
দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনের সঙ্গে তুলনা করলে ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০ অনুযায়ী, ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অভিযোজনের জন্য প্রায় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দরকার। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু অর্থায়নের প্রবাহ বছরে প্রায় ২ থেকে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে সীমিত।
এর অর্থ হলো, বরাদ্দ বাড়লেও কাঠামোগত অর্থায়ন ঘাটতি রয়ে গেছে। জলবায়ু ঝুঁকি যত দ্রুত বাড়ছে, অর্থায়ন তত দ্রুত বাড়ছে না। ফলে বাংলাদেশকে একদিকে নিজস্ব সীমিত সম্পদ দিয়ে অভিযোজন চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব প্রাপ্তির ব্যবধানও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তবে অর্থের ঘাটতি গল্পের একমাত্র অংশ নয়। আরও গভীর একটি প্রশ্ন আছে—বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীলতা আসলে কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
সহনশীলতার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ভিত্তি
জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত বাঁধ, সড়ক, আশ্রয়কেন্দ্র, নদী ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, কৃষি প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা সামনে আসে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে একটি পরিবার বা একটি সমাজ জলবায়ু অভিঘাতের পর কীভাবে টিকে থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু অবকাঠামোয় পাওয়া যায় না।
বন্যার পর ঘরে পানি ঢুকলে কে শিশুদের নিরাপদে রাখে? পানির উৎস দূষিত হলে কে দূরে গিয়ে পানি সংগ্রহ করে? ঘূর্ণিঝড়ে ঘর নষ্ট হলে কে পরিবারকে আবার গুছিয়ে দাঁড় করানোর কাজ করে? তাপপ্রবাহে শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষের যত্ন কে নেয়? খাদ্য সংকট হলে কে নিজের খাবার কমিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের খাওয়ায়?
বাংলাদেশের বহু জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একই দিকে ইঙ্গিত করে—নারী ও কন্যাশিশু।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা শুধু সরকারি বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক তহবিল বা অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হচ্ছে না। এর একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে নারীদের অদৃশ্য, অবৈতনিক এবং অবমূল্যায়িত পরিচর্যা শ্রমের ওপর।
নারীর অবৈতনিক শ্রম: জলবায়ু অভিযোজনের অদৃশ্য ভর্তুকি
যখন বন্যায় পানির উৎস নষ্ট হয়, নারীদের অনেক দূর থেকে পানি আনতে হয়। যখন ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নারীরাই শিশু, প্রবীণ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী সদস্যদের যত্নের দায়িত্ব বেশি নেয়। যখন তাপপ্রবাহের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, তখন বাড়ির ভেতর অসুস্থদের পরিচর্যার চাপও নারীর ওপর পড়ে। যখন খাবারের সংকট তৈরি হয়, তখন অনেক নারী নিজের বিশ্রাম, নিজের খাদ্য ও নিজের স্বাস্থ্যকে পিছিয়ে দিয়ে পরিবারের অন্যদের টিকিয়ে রাখেন।
এই শ্রমের কোনো মজুরি নেই। কোনো বাজেট লাইনে তা দেখা যায় না। মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে এর মূল্য ধরা হয় না। কিন্তু এই শ্রম ছাড়া জলবায়ু দুর্যোগের পর বহু পরিবার টিকে থাকতে পারত না।
এই অর্থে বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা নারীর অবৈতনিক পরিচর্যা শ্রম দিয়ে ভর্তুকি পাচ্ছে। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার এই শ্রমের ওপর নির্ভর করছে, কিন্তু নীতিমালা ও বাজেটে তার স্বীকৃতি খুবই সীমিত।
এটাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। যে শ্রম অভিযোজনকে সম্ভব করছে, সেটি যদি নীতিতে অদৃশ্য থাকে, তাহলে বাজেট সংখ্যায় বড় হলেও ন্যায্য হয় না।
জলবায়ু সংকট নারীর ওপর আলাদা চাপ তৈরি করে
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। দরিদ্র মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর, চরাঞ্চল, নদীভাঙন এলাকা ও নগর বস্তির মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এই ঝুঁকির ভেতরও নারীরা অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুতি হলে নারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। আশ্রয়কেন্দ্র বা অস্থায়ী বসতিতে নারীরা সহিংসতা, শোষণ ও হয়রানির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। পরিবার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে গেলে মেয়েশিশুর স্কুলছুট হওয়া বা অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
লবণাক্ততা ও ক্ষতিগ্রস্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত সমস্যা তৈরি হয়। নিরাপদ পানি না থাকলে শুধু পানির সংকটই হয় না; নারীর দৈনন্দিন শ্রমও বেড়ে যায়।
সুতরাং জলবায়ু বাজেট যদি শুধু অবকাঠামো দেখে, কিন্তু নারীর জীবনযাত্রার এই বাস্তব চাপগুলো না দেখে, তাহলে তা পূর্ণাঙ্গ জলবায়ু বাজেট হতে পারে না।
পরিচর্যা শ্রমকে জলবায়ু কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে
নারীর পরিচর্যা শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু নারী অধিকার বা সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি জলবায়ু অভিযোজনের প্রশ্ন। কারণ পরিবার ও সমাজের অভিযোজন সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু যত্ন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও জনসেবার ওপর।
যদি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা উন্নত হয়, তাহলে নারীদের দূরে গিয়ে পানি আনতে কম সময় লাগবে। যদি স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য হয়, তাহলে অসুস্থ পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার চাপ কমবে। যদি শিশু যত্নসেবা থাকে, তাহলে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে নারীরা কাজ, পুনর্বাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি অংশ নিতে পারবেন। যদি সামাজিক সুরক্ষা কার্যকর হয়, তাহলে পরিবার খাদ্য সংকটে পড়লে নারীর ওপর অদৃশ্য চাপ কমবে।
তাই পানি, স্বাস্থ্য, শিশু যত্ন, সামাজিক সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল জনসেবা—এসবকে শুধু কল্যাণমূলক খাত হিসেবে দেখা ভুল হবে। এগুলো জলবায়ু অভিযোজনের মূল উপাদান।
বাংলাদেশের নিজস্ব নীতির সঙ্গে বাজেটের মিল দরকার
বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক লিঙ্গ কর্মপরিকল্পনা ২০২৩ নারীর নেতৃত্ব, সম্পদে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং জলবায়ু কার্যক্রমে লিঙ্গ সমতা জোরদারের কথা বলে। অর্থাৎ নীতিগতভাবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে স্বীকার করেছে যে জলবায়ু কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ ও সুরক্ষা জরুরি।
কিন্তু নীতি থাকলেই যথেষ্ট নয়। সেটি বাজেটে প্রতিফলিত হতে হবে। জলবায়ু বাজেটে কোন প্রকল্প নারীদের উপকার করছে, কোন প্রকল্প নারীর শ্রম কমাচ্ছে, কোথায় নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিচ্ছেন, কোথায় নারীনেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো অর্থ পাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে জানা দরকার।
শুধু বরাদ্দ বাড়লেই চলবে না; বরাদ্দের প্রভাবও দেখতে হবে।
ন্যায্য জলবায়ু বাজেটের তিনটি জরুরি অগ্রাধিকার
প্রথমত, লিঙ্গ সংবেদনশীল জলবায়ু বাজেট পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে হবে। এতে শুধু কত টাকা বরাদ্দ হলো তা নয়, কারা সেই অর্থের সুফল পেল, নারীর শ্রম কমল কি না, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী কতটা উপকৃত হলো—এসবও মূল্যায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন কার্যক্রম বাড়াতে হবে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যারা প্রতিদিন সংকটের মুখোমুখি হন, তাদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারীনেতৃত্বাধীন স্থানীয় সংগঠনগুলোকে সরাসরি সহায়তা দিতে হবে। কারণ তারা জানে কোন এলাকায় পানির সংকট বেশি, কোথায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি, কোন পরিবার বেশি ঝুঁকিতে আছে, আর কোন ধরনের সহায়তা বাস্তবে কাজ করে।
তৃতীয়ত, নারীর অবৈতনিক পরিচর্যা শ্রম কমাতে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু যত্ন, সামাজিক সুরক্ষা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এসব খাতে বিনিয়োগ করলে শুধু নারীর বোঝা কমবে না; পুরো সমাজের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়বে।
অবকাঠামো দরকার, কিন্তু যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশের মতো দেশে বাঁধ, নদী ব্যবস্থাপনা, আশ্রয়কেন্দ্র, কৃষি অভিযোজন এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু এগুলোকে মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত না করলে জলবায়ু ন্যায়বিচার পূর্ণতা পাবে না।
একটি বাঁধ হয়তো গ্রামকে বন্যার পানি থেকে কিছুটা বাঁচাতে পারে। কিন্তু সেই গ্রামের নারীর নিরাপদ পানি না থাকলে, স্বাস্থ্যসেবা না থাকলে, শিশুর স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে, পরিবারের খাদ্য সংকট হলে এবং দুর্যোগের পর পুনর্গঠনের কাজ একা তার কাঁধে পড়লে—সেই অভিযোজন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
জলবায়ু বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ঝুঁকি কমানো নয়; অসমতা কমানোও। কারণ জলবায়ু সংকট যেখানে অসমভাবে আঘাত করে, সেখানে বাজেটও যদি সমতার দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া তৈরি হয়, তাহলে তা অন্যায়কে আরও গভীর করতে পারে।
নারীর শ্রমের মূল্য না দিলে সহনশীলতা অসম্পূর্ণ
বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতার গল্পে নারীদের কথা প্রায়ই কম বলা হয়। অথচ দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, দুর্যোগের সময় পরিবারকে রক্ষা করা, দুর্যোগের পর ঘর পুনর্গঠন, পানি সংগ্রহ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, শিশু ও প্রবীণদের যত্ন, অসুস্থদের সেবা—এসব কাজের বড় অংশ নারীর কাঁধে পড়ে।
এই শ্রমকে স্বাভাবিক পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই কাজের পরিমাণ, সময় ও কষ্ট বেড়ে যাচ্ছে। তাই জলবায়ু নীতিতে এই শ্রমের স্বীকৃতি থাকা জরুরি।
যে শ্রম দেখা যায় না, তার জন্য বাজেটও তৈরি হয় না। আর যে শ্রমের হিসাব নেই, তার বোঝাও কমে না।
বাংলাদেশ জলবায়ু বাজেট প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। প্রস্তাবিত অর্থবছর ২০২৬-২৭ বাজেটে প্রায় ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং অভিযোজন খাতে প্রায় ৭৫ শতাংশ গুরুত্ব—এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কেবল বরাদ্দের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়।
ন্যায্য জলবায়ু বাজেট মানে এমন বাজেট, যা বুঝতে পারে কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, আর কারা অদৃশ্য শ্রম দিয়ে পরিবার ও সমাজকে টিকিয়ে রাখছে।
বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা আজও বহু নারী ও কন্যাশিশুর অবৈতনিক পরিচর্যা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এই শ্রম মাপা হয় না, বাজেটে ধরা হয় না, নীতিতে যথেষ্ট স্বীকৃতি পায় না। অথচ এই অদৃশ্য শ্রম ছাড়া দুর্যোগের পর বহু পরিবার দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না।
তাই জলবায়ু বাজেটকে সত্যিকার অর্থে ন্যায্য করতে হলে বাঁধ, অবকাঠামো ও প্রকল্পের পাশাপাশি নারীর শ্রম, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পানি, শিশু যত্ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে কেন্দ্রে আনতে হবে।
জলবায়ু ন্যায়বিচার শুধু এই প্রশ্ন নয়—কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? এটি সেই প্রশ্নও—কে সবচেয়ে বেশি কাজ করে সমাজকে টিকিয়ে রাখছে, অথচ যার অবদান অদৃশ্য রয়ে গেছে?
যতদিন নারীর এই অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি, পরিমাপ ও বাজেটায়ন না হবে, ততদিন বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা নীরবে এক অসম ভর্তুকির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।

