দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিদিন জমা পড়ছে কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই এখন অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা যাচ্ছে না। নতুন মামলা দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া কিংবা সম্পত্তি ক্রোক, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আর গ্রেপ্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করার পর প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে এমন অচল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিশন না থাকায় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেমে গেছে। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলো অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এসবের জন্য কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন।
একইভাবে মামলা দায়ের, তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল, সম্পত্তি জব্দ বা বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদনসহ সব সিদ্ধান্তের জন্য কমিশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু গত ৩ মার্চ কমিশনের তিন সদস্য একযোগে পদত্যাগ করার পর থেকে সেই সিদ্ধান্তগুলো আর নেওয়া যাচ্ছে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পরিবেশ সরকারই সৃষ্টি করেছে। ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন পুনর্গঠনের বিষয়টিও সরকারের অজানা নয়। জেনে-বুঝে সরকার দুদককে স্থবির করে রেখেছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আবদুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের অন্য দুই সদস্য ছিলেন সাবেক জেলা জজ মির্জা মুহাম্মদ আলী আকবর আজিজী এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও তাঁরা দায়িত্ব পালন করেন মাত্র এক বছর দুই মাস।
দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশনের অনুমোদন ছাড়া নতুন অনুসন্ধান বা তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন করা যায় না। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দুদকের সচিবের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে সরকারকে চিঠিও পাঠানো হয়। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কমিশন পদত্যাগের আগে শুরু হওয়া কিছু অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান থাকলেও বিভাগীয় পরিচালক ও মহাপরিচালক পর্যায়ে ফাইল প্রস্তুত হয়ে পড়ে আছে। কমিশন না থাকায় সেগুলো অনুমোদনের জন্য আর এগোচ্ছে না। এতে শত শত ফাইল আটকে গেছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম জানান, কমিশন না থাকায় নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে মামলা দায়ের ও অভিযোগপত্র অনুমোদনের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী কমিশন পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্গঠন করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে নতুন কমিশন গঠনের পুরো প্রক্রিয়া সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
জানা গেছে, নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আইন অনুযায়ী কমিশন নিয়োগের আগে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করতে হয়। এ লক্ষ্যে ২ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারক মনোনয়নের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। দুদক সূত্র বলছে, অনুসন্ধান কমিটির জন্য আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারক ইতোমধ্যে মনোনীত হয়েছেন। বাকি তিনজন দ্রুত মনোনীত করা হবে। এরপরই কমিটি কাজ শুরু করবে।
গত সোমবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তিনি এটিকে ‘মধ্যবর্তী ব্যবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আরও শক্তিশালী দুদক গঠনের লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের আলোচনা চলছে।
তবে কমিশন না থাকায় দুর্নীতিবাজদের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, বর্তমানে বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত বড় দুর্নীতির অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও কমিশন অচল থাকায় অনেকেই সুযোগ নিচ্ছেন।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, দুদক কার্যত অচল থাকায় দুর্নীতিবাজরা তাঁদের অবৈধ সম্পদ সরানোর সুযোগ পাচ্ছেন। এতে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তিনি দ্রুত শূন্য পদ পূরণের দাবি জানান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, জেনে-বুঝে দুদককে স্থবির করে রাখা হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, এতে দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করার বার্তা যাচ্ছে এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কার্যত দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি কবে পুরোপুরি সচল হবে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

