চট্টগ্রামে নিরাপদ খাদ্য আদালতের মাঠ পর্যায়ের তদারকি কার্যক্রমে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অনিয়ম ও অসঙ্গতির চিত্র উঠে এসেছে। সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে একাধিক গুরুতর লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
গতকাল ২০ জুন ২০২৬ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে আবুল খায়ের ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, মধুবন সুইটস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং ময়মনসিংহ এগ্রোতে বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে। পরিদর্শনে দেখা যায়, খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াকরণে বিষাক্ত প্লাস্টিক জাতীয় উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া চানাচুর, চিড়া ও বুট উৎপাদনে পোড়াতেল ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় বর্জ্য পদার্থ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।
আরও দেখা যায়, খাদ্যপণ্য মোড়কীকরণে নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর তথ্য সংযোজনের অভিযোগও পাওয়া যায়। ম্যাংগো ফ্রুট পাল্প সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণেও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের চিত্র উঠে আসে। খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রেও ঘাটতি লক্ষ্য করা হয়।
অভিযানে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের প্রমাণ মেলে। সেখানে বিভিন্ন পোকামাকড়ের অবাধ বিচরণ দেখা যায়। নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন, বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণ ও তা পুনরায় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহারের অভিযোগও উঠে আসে। এছাড়া খাদ্য স্পর্শক হিসেবে খোলা কাগজ ও খবরের কাগজ ব্যবহারের বিষয়টি ধরা পড়ে। মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত পদ্ধতি না মেনে মোড়কীকরণের বিষয়টিও অভিযানে উঠে আসে।
অভিযানের নেতৃত্ব দেন চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও নিরাপদ খাদ্য আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মোস্তফা। অভিযানে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, র্যাব ও আনসার সদস্যরা অংশ নেন।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর চট্টগ্রাম বিভাগ ও মহানগরের নেতারা এই অভিযানের প্রশংসা করেছেন। তারা আদালতের বাইরে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে এ ধরনের তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিচারককে ধন্যবাদ জানান এবং এ উদ্যোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান। সংগঠনের পক্ষ থেকে আজ (২১ জুন ২০২৬) তারিখে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই মতামত জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, মহানগর সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু, সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ম সম্পাদক মোঃ সেলিম জাহাঙ্গীর, সাংগঠনিক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস এবং যুব গ্রুপ চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবু হানিফ নোমান।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ভোক্তারা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রতারণা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন কিন্তু সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর নজরদারির অভাবে এর সঠিক প্রতিকার মিলছে না। এতে খাদ্যবাহিত রোগ বাড়ছে বলে তারা দাবি করেন।
তাদের মতে, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগীর চাপের চিত্রই এর প্রমাণ। এমন কোনো পরিবার নেই, যেখানে নিয়মিত ওষুধ সেবনের প্রয়োজন পড়ে না বলেও তারা মন্তব্য করেন। তাদের ভাষায়, পুরো জাতিই এক ধরনের রোগগ্রস্ত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।
নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, আদালতের গণ্ডির বাইরে গিয়ে চট্টগ্রামের নিরাপদ খাদ্য আদালত যেভাবে ধারাবাহিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে, তা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ ভোক্তা অধিকার ও অন্যান্য অধিকার রক্ষায় সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন গতি আনবে বলেও তারা মনে করেন।
প্রতিবেদক: মোঃ রাসেল উদ্দীন
বিভাগীয় সংগঠক, ক্যাব চট্টগ্রাম।

