বিশ্বের মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাছসহ জলজ প্রাণী চাষে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম অবস্থান ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে নদী, হাওর, বিল ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে ভারতের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে বৈশ্বিক মৎস্য খাতে দেশের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এফএওর ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জলজ প্রাণী উৎপাদনের কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ামুখী হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় অংশীদার বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে মাছসহ জলজ খাতের মোট উৎপাদন ২৩ কোটি ৫০ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর মধ্যে জলজ প্রাণীর উৎপাদন ছিল ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন। বৈশ্বিক এ খাতের আর্থিক মূল্যও কয়েকশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রমাণ।
জলজ প্রাণী চাষের ক্ষেত্রে চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও ভিয়েতনামের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ২০২৪ সালে দেশে মাছ চাষের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ লাখ ৭৮ হাজার টনে। যদিও চীন ও ভারতের উৎপাদন বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি, তবুও সীমিত ভূখণ্ড ও সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশের এই অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত চার দশকে দেশের মৎস্য খাতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা এক ধরনের নীরব বিপ্লব। আশির দশক থেকে শুরু হওয়া পুকুরভিত্তিক মাছ চাষ, উন্নত পোনা ব্যবহার, গবেষণাভিত্তিক উৎপাদন পদ্ধতি এবং সরকারি সম্প্রসারণ কার্যক্রম দেশের মাছ উৎপাদনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় শক্তি হলো অভ্যন্তরীণ জলাশয়। নদী, হাওর, বিল ও খাল থেকে মাছ আহরণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ২০২৪ সালে দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে প্রায় ১৪ লাখ ১২ হাজার টন মাছ আহরণ করা হয়েছে, যা বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ মাছ আহরণের উল্লেখযোগ্য অংশ। এই খাতে কেবল ভারতই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলসম্পদ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের মৎস্যনির্ভর জীবনধারা এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেশের মৎস্য খাতকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
অর্থনীতিতেও মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান দুই শতাংশের বেশি। দেশের কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে মাছ উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খামারিরা এখনো উন্নতমানের পোনা, মানসম্পন্ন খাদ্য, উৎপাদন বিমা এবং ন্যায্য বাজারমূল্য নিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হন। জলবায়ু পরিবর্তন, জলদূষণ এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংকোচনও ভবিষ্যতের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এফএওর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাছ চাষই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাষের মাছের চাহিদাও বাড়বে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জলজ প্রাণী উৎপাদন আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি নতুন সুযোগেরও বার্তা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দেশ শুধু উৎপাদনেই নয়, বৈশ্বিক মৎস্যবাণিজ্যেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সব মিলিয়ে, চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বসেরা পাঁচ দেশের মধ্যে অবস্থান ধরে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় স্থান অর্জন বাংলাদেশের মৎস্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিরই প্রতিফলন। এখন এই অর্জনকে টেকসই ও আরও লাভজনক করে তোলাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

