কলামিস্ট শরিফুল হাসান তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ ও সামাজিক মূল্যবোধের সংকট নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। পাঠকদের জন্য লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
আপনার আয়টা হালাল তো? আপনার বাবা, কোন স্বজন কিংবা যে আত্মীয়কে নিয়ে এতো গর্ব করছেন সৎভাবে আয় করেন তো তিনি? মনে রাখবেন আইজিপি, সচিব থেকে শুরু করে যতো বড় কর্মকর্তাই তিনি হন না কেন এই এতোদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকলেও তাঁর বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়াসহ সবমিলিয়ে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা তিনি পেতে পারেন।
এই সব খরচ সামলে তিনি যদি বিপুল সম্পদের মালিক হন কিন্তু তার কোন জমিদারি নেই তাহলে প্রশ্ন করুন এতো গাড়ি বাড়ি কোথা থেকে এলো? কী করে তিনি আপনাকে বিদেশে বা দামী স্কুলে পড়ানোর টাকা দেন? সেই প্রশ্ন না তুলে আপনি যদি ১৫ লাখ টাকায় ছাগল আর ৩৭ লাখ টাকায় গরু কোরবানি দেন আর কোটি টাকার একাধিক গাড়িতে চড়ে গর্ব করেন জেনে রাখবেন আপনি ছাগলের চেয়েও অধম।
গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এই কথাগুলো লিখছি। কারো যদি বাপের সম্পদ থাকে কিংবা বৈধ আয় থাকে আপনি বাড়ি গাড়ি কিনুন কোন সমস্যা নেই। আপনার ভালো থাকার অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু আপনি যদি সরকারি চাকরি করে থাকেন এবং দুর্নীতি অনিয়ম করে সম্পদ গড়েন তাহলে সেই টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হবে। কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর যে বেতন সেই টাকায় সংসার চালানো কঠিন। সেখানে গাড়ি বাড়ি ফ্ল্যাট করার সুযোগ সীমিত। কাজেই আপনার বাবা, সন্তান কিংবা স্বজনের সম্পদ দেখে তাকে সুপারম্যান ভাববেন না। বরং মনে রাখবেন তিনি আদৌতে একজন অসৎ মানুষ।
শুধু সরকারি চাকরিজীবী নন, আপনার বাবা বা স্বজন রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, বিচারক, সাংবাদিক, শিক্ষক, উপাচার্য, প্রকৌশলী, বেসরকারি চাকরিজীবী কিংবা যাই হোন না কেন আপনি যদি গাড়ি বাড়ি থেকে শুরু করে অঢেল সম্পদ দেখেন এবং যখন যা চান তাই পেয়ে থাকেন কিন্তু আপনাদের জমিদারি না থাকে তাহলে তাঁর সম্পদের উৎস নিয়ে সন্দেহ করুন। জানতে চান তিনি শতভাগ হালাল পথে উপার্জন করেন কি না?
আসলে একটা ভয়াবহ সমাজব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে আমরা। এইতো ২০-৩০ বছর আগেও যে লোকটা দুর্নীতি করতো তার দিকে সবাই বাঁকা চোখে তাকাতো। আর আজকে যে কোন ভাবে টাকা আয় করলেই, গাড়ি বাড়ি সম্পদ থাকলেই আমরা তাদের তোয়াজ করি। মসজিদ কমিটির সভাপতি থেকে শুরু করে নানান পথ পদবীতে বসাই। নানাভাবে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে চাই। অথচ এই নোংরা কিটগুলোর আশ্রয় হওয়া উচিত ছিল জেলখানায়।
আফসোস আমাদের দুদক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সব কাঠামো তাদের তোয়াজ করে। আর আমাদের মহান নেতারা বলেন, ব্যক্তির দুর্নীতি দায় কেউ নেবে না। অথচ ওই মহান নেতারা বুঝেও বোঝেন না পুলিশের আইজিপি, সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য বা যে কোন একটা সরকারি পদ আছে বলেই তিনি সেই পথ ভাঙিয়ে দুর্নীতি করেন। আফসোস এই দুর্নীতিবাজদের বিচার তো দূরের কথা উল্টো তারাই নানান পদে বসে। শুদ্ধাচার পুরস্কার পায়।
জানি না এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা কবে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে কিন্তু আমি মনে করি প্রতিটা প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের এগুলো বোঝা উচিত। প্রশ্ন তোলা উচিত। আপনার আমার আশেপাশে এমন দুর্নীতিবাজ দেখলে সমীহ না করে আত্মীয়তা না করে তাঁর অবৈধ আয় বা দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। অন্তত কোনভাবেই তিনি বাহবা পেতেন না। আর তিনি আপনারা নিজের বাবা হলে সবার আগে সেই প্রশ্ন তোলা উচিত। বাবার আয় হারাম হলে সেই আয়ে দেশে কিংবা বিদেশে বিলাসিতা না করে বাবাকে বলুন প্লিজ বাবা হারাম পথে আয় করো না। দেশটার বারোটা বাজিও না। একইভাবে সব বাবাদের বলবো আপনার সন্তানের বাড়ি গাড়ি সম্পদ দেখলে তার উৎস নিয়ে প্রশ্ন করুন।
কথাগুলো বলছি, কারণ এই বাংলাদেশ সংকটটা যতোটা না অর্থনৈতিক তার চেয়েও বেশি মানবিক মূল্যবোধের। সত্যিকারের সব সৎ কর্মকর্তা কর্মচারীকে শ্রদ্ধা এবং সব দপ্তরেই এমন কর্মকর্তা কর্মচারী আছেন। তাদের জন্য শ্রদ্ধা। তবে বাস্তবতা হলো একদল লোক এখানে দুর্নীতি লুটপাট করে টাকা পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। আরেকদল মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করেও কোনমতে টিকে থাকতে পারছেন না।
ভয়াবহ এই দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা দরকার। এই দেশের প্রতিটা বড় বাড়ি, ফ্ল্যাট দামি গাড়ির মালিকের সম্পদের উৎস সন্ধান করা উচিত। কিন্তু এই রাষ্ট্র কখনো সেগুলো করবে না। কারণ এই দুর্বত্তরাই নানা নামে দেশ চালায়।
কাজেই রাষ্ট্র যতোদিন ব্যবস্থা নিচ্ছে না ততদিন আপনি অন্তত আপনার বাবার সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন করুন। একইভাবে বাবারা সন্তানের অবৈধ সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন তুলুন। আর সব বাবা-মায়েরা সন্তানদের মানবিক সৎ মানুষ বানানোর চেষ্টা করুন। সন্তানেরাও বাবা-মায়ের কাছে জবাবদিহিতা জানতে চান। কারণ সারাক্ষণ নিজের স্বার্থ ক্ষমতা পদ পদবী টাকা পয়সার কথা ভাবতে গিয়ে আমরা নিজেরা নষ্ট হচ্ছি, ধ্বংস করছি এই দেশ সমাজ। সৎ ও মানবিক মূল্যবোধ ছাড়া এই দেশ সমাজ সংস্কৃতি ঠিক করার কোন উপায় নেই।
আমার নিজের বাবার কথা বলি। তিনিও সরকারি চাকরি করতেন রোজার ঈদ বাদে আমাদের কখনো নতুন কাপড় দিতে পারতেন না। তিনি সবসময় বলতেন বাড়ি গাড়ি টাকা পয়সাসহ আশপাশে যা দেখো সেগুলো সত্যিকারের সম্পদ নয়, বরং সততা সম্মান মানবিক মূল্যবোধসহ যেগুলো দেখা যায় না সেগুলোই আসল সম্পদ। সারা জীবন অদেখা সেই সম্পর্ক অর্জন করার চেষ্টা করবে। কখনো হারাম পথে আয় করবে না। মানুষকে কষ্ট দেবে না।
সারা জীবন কথাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সত্যি বলছি আজকাল মাঝে মধ্যে ভীষণ রাগ হয়। এত কষ্ট করে আমরা বাঁচার চেষ্টা করি কিন্তু চারপাশের একদল দুর্বৃত্ত দুর্নীতি করে লুটপাট করে বিদেশে টাকা পাচার করে দেশটা বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। আর সমাজও এদের মেনে নিচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারলে মানসিক শান্তি পেতাম।
ওপরওয়ালা আমাদের সবাইকে মানবিক বোধ দিন। সৎ ভাবে বাঁচা তৌফিক দিক। অন্তত আমরা যেন অসততাকে প্রশ্ন করতে পারি অন্তত নিজের বাবার বা সন্তানের। আমরা যদি নিজের বাবা বা সন্তান কিংবা স্বজনদের দুর্নীতি লুটপাট নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারি তাহলে বাকি সব কথা অর্থহীন। যাই হোক হালাল আয় করা সব বাবা আর সন্তানেরা ভালো থাকুক। দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন লুটপাট বন্ধ হোক এ দেশে। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ।
লেখক: কলামিস্ট শরিফুল হাসান

