দেশের চার মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে সরকারের বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি, তরঙ্গ ব্যবহার ফি, জরিমানা এবং বিভিন্ন কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত দাবির বিপরীতে এই বিপুল অর্থ এখনও আদায় হয়নি। এর বড় অংশ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টির নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
বুধবার জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিটকসহ দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের কাছেই সরকারের উল্লেখযোগ্য অঙ্কের পাওনা রয়েছে।
সরকারি হিসাবে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটকের কাছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা ইকুইটি বা শেয়ারে রূপান্তরের একটি প্রস্তাব বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে। এ প্রস্তাব অনুমোদিত হলে টেলিটকের দায়ের একটি বড় অংশ নতুন কাঠামোয় সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বেসরকারি অপারেটরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে গ্রামীণফোনের। বিভিন্ন অডিট আপত্তি, রাজস্ব দাবি ও অন্যান্য পাওনা মিলিয়ে কোম্পানিটির কাছে সরকারের নিট বকেয়া প্রায় ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা। অতীতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কয়েক ধাপে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং ভ্যাট সংক্রান্ত রায়ের পর আরও কয়েকশ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও বড় অঙ্কের দাবি এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
রবি আজিয়াটার ক্ষেত্রেও অডিট আপত্তি ও ভ্যাট সংক্রান্ত পাওনা নিয়ে বিরোধ চলছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে সরকারের মোট বকেয়া প্রায় ৬১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে অডিট দাবির একটি অংশ এবং রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোও আদালতে বিচারাধীন।
অন্যদিকে বাংলালিংকের কাছেও সরকারের দাবি করা অর্থের পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা। বিভিন্ন অডিট আপত্তি ও ভ্যাট সংক্রান্ত পাওনা মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া প্রায় ৫৫৫ কোটি টাকা। এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
টেলিযোগাযোগ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে সরকারের এই আর্থিক বিরোধ নতুন নয়। বিগত কয়েক বছর ধরে অডিট আপত্তি, রাজস্ব হিসাব এবং ভ্যাট নির্ধারণ নিয়ে একাধিক মামলা আদালতে চলমান রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের বিষয়টি অনিশ্চয়তায় রয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এবং টেলিযোগাযোগ খাতের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার ও অপারেটরদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বিনিয়োগ পরিবেশও আরও স্থিতিশীল হবে।
তাদের মতে, আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং স্বচ্ছ রাজস্ব নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় অঙ্কের বকেয়া ও বিরোধের পুনরাবৃত্তি কমে আসবে। বর্তমানে দেশের টেলিযোগাযোগ খাত ডিজিটাল সেবা, মোবাইল ইন্টারনেট ও আর্থিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হওয়ায় এ খাতের আর্থিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

