সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের এই সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের দাবি, যে মাজারে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ দান হিসেবে আসে, সেখানে সরকারি তহবিলের অর্থ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট নয়।
সম্প্রতি মাজারের দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে আলোচনায় আসেন সারওয়ার আলম। জুনের মাঝামাঝি সময়ে তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শন করে আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে অধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা জানান। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী দানের ডেক ও দানবাক্স সিলগালা করা হয়।
এই পদক্ষেপের পর থেকেই সিলেটে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। এক পক্ষ বিষয়টিকে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও অন্য পক্ষের অভিযোগ ছিল, প্রশাসন মাজারের প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করছে। বিতর্কের মধ্যেই গত ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সারওয়ার আলমকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
প্রত্যাহারের আদেশ জারির পরদিন তিনি মাজারে গিয়ে সিলগালা করা দানবাক্স ও ডেকগুলো খুলে গণনার ব্যবস্থা করেন। প্রশাসনের উপস্থিতিতে অর্থ গণনা শেষে জানানো হয়, আটটি ডেক ও দানবাক্স থেকে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা নগদ পাওয়া গেছে। এছাড়া কিছু স্বর্ণালংকার ও বিদেশি মুদ্রাও উদ্ধার হয়। পরে এসব অর্থ মাজারের নামে নতুন খোলা একটি ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা একই হিসাবে জমা দেওয়ার ঘটনা। দায়িত্ব হস্তান্তরের ঠিক আগে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, মাজারে নিয়মিত উল্লেখযোগ্য অঙ্কের দান আসে। সাম্প্রতিক গণনাতেই বিপুল অর্থের উপস্থিতি দেখা গেছে। এমন বাস্তবতায় সরকারি তহবিলের অর্থ সেখানে স্থানান্তরের যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
সমালোচকদের আরেকটি বক্তব্য হলো, মাজারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে যখন জনমনে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে, তখন জেলা প্রশাসনের অর্থ অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা অধিক যুক্তিযুক্ত হতে পারত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ সহায়তা বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করলে তার সামাজিক প্রভাব আরও বেশি হতে পারত বলে মনে করছেন তারা।
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের নেতারাও বিষয়টিকে রাজনৈতিক বা প্রতীকী বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের অভিযোগ, মাজারকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে যে আলোচনা চলছিল, সেই প্রেক্ষাপটে বিদায়ের আগে ৫ লাখ টাকা দানের সিদ্ধান্ত জনদৃষ্টি আকর্ষণের একটি কৌশল হতে পারে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সারওয়ার আলম জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে সিদ্ধান্তের পেছনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সারওয়ার আলম। দায়িত্ব পালনকালে ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযানসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক উদ্যোগের কারণে তিনি আলোচনায় ছিলেন। তবে মাজারের দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।
সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথমত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের ভূমিকার সীমা কোথায়। দ্বিতীয়ত, সরকারি তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ কীভাবে হওয়া উচিত। মাজারে ৫ লাখ টাকা দানের ঘটনা তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরকারি অর্থের ব্যবহার, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

