দেশের কর আপিল ব্যবস্থায় মামলার জট এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কর আপিলেট ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন বেঞ্চে বর্তমানে ১ হাজার ৬২৪টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এই জট কমাতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে বাজেট-সংক্রান্ত আলোচনার সময় এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য তুলে ধরেন। সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দেশের আটটি দ্বৈত বেঞ্চে এসব মামলা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, করসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সবচেয়ে বড় চাপ রাজধানী ঢাকার বেঞ্চগুলোর ওপরই পড়েছে। মোট আটটি বেঞ্চের মধ্যে পাঁচটিই ঢাকায় অবস্থিত এবং অনিষ্পন্ন মামলার বড় অংশ এসব বেঞ্চে জমা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার প্রথম দ্বৈত বেঞ্চে ২৭৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দ্বিতীয় বেঞ্চে রয়েছে ৩১৮টি মামলা, যা সব বেঞ্চের মধ্যে সর্বোচ্চ। তৃতীয় বেঞ্চে ২৪৯টি, চতুর্থ বেঞ্চে ২০৭টি এবং পঞ্চম বেঞ্চে ৩০৫টি মামলা অনিষ্পন্ন রয়েছে।
রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম বেঞ্চে ১৬২টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। অন্যদিকে খুলনা বেঞ্চে ৫১টি এবং রংপুর বেঞ্চে ৫৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে কর আপিল সংক্রান্ত অধিকাংশ বিরোধ এখনও ঢাকা কেন্দ্রিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর আপিল মামলার দীর্ঘসূত্রতা শুধু রাজস্ব প্রশাসনের জন্য নয়, ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো করদাতা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর দাবি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে তা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ও বিলম্বিত হয়।
অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছেন, আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী কর আপিল ট্রাইব্যুনালে থাকা মামলাগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচারিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার মাধ্যমে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কর প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলার জট কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং দ্রুত শুনানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে করদাতা ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প ব্যবস্থাও কার্যকর করা গেলে আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আহরণ বাড়ার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও আরও শক্তিশালী হবে। ফলে কর আপিল ট্রাইব্যুনালে জমে থাকা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এখন শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজনই নয়, অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

