সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় সরকারি কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা জৈব সার নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, উন্নতমানের জৈব সারের পরিবর্তে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পলিথিন, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যমিশ্রিত নিম্নমানের উপাদান। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে উপকারভোগীদের মধ্যে। অনেক কৃষক সার গ্রহণ না করে শুধু গাছের চারা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
বুধবার উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রাঙ্গণে চারা ও জৈব সার বিতরণের সময় এ অনিয়ম সামনে আসে। সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা এবং পরিচর্যার জন্য জৈব সার দেওয়ার কথা ছিল।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ২০০ জন কৃষক এবং ১০০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য আম, জলপাই, নিম, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির চারা বরাদ্দ ছিল। পাশাপাশি ৩০ জন কৃষককে লেবুর চারা দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। প্রতিটি চারার সঙ্গে ৩০ কেজি করে জৈব সার সরবরাহের নির্দেশনা ছিল, যাতে গাছগুলো সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
কিন্তু বিতরণ কার্যক্রম চলাকালে একাধিক কৃষক সারের বস্তা খুলে হতাশ হয়ে পড়েন। তাদের দাবি, সারের পরিবর্তে বস্তার ভেতরে ছিল নানা ধরনের প্লাস্টিকজাত বর্জ্য, পলিথিন ও অপ্রয়োজনীয় ময়লা। এসব উপাদান জমিতে ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা বাড়ার পরিবর্তে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে সরকারি উদ্যোগে বিতরণ করা জৈব সারের মান তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ছিল। কিন্তু এবার সরবরাহকৃত উপকরণের মান এতটাই খারাপ যে তা কৃষি কাজে ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে এমন অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শুধু সার নয়, চারার মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক উপকারভোগী। তাদের মতে, চারাগুলোর আকার ছিল ছোট এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। এছাড়া গাছকে সোজা রাখতে বাঁশের খুঁটি দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকের হাতে নিম্নমানের ও ছোট আকারের বাঁশ তুলে দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার মধ্যেও অস্বস্তি দেখা গেছে। তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন, সরবরাহ করা সারের একটি অংশ প্রত্যাশিত মানের নয় এবং তা কৃষি কাজে ব্যবহারযোগ্য কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক নেতারা বলছেন, কৃষকদের জন্য নেওয়া উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে এ ধরনের অনিয়ম শুধু সরকারি উদ্যোগকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং প্রকৃত উপকারভোগীদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাদের মতে, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব বস্তায় নিম্নমানের বা অনুপযুক্ত উপাদান পাওয়া গেছে, সেগুলো ফেরত পাঠিয়ে নতুন করে মানসম্মত জৈব সার সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে কারও গাফিলতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কামারখন্দসহ পুরো জেলায় মোট ১৪ হাজার ৬৫০ জন কৃষকের মধ্যে চারা ও জৈব সার বিতরণের কার্যক্রম চলছে। জনপ্রতি ৩০ কেজি করে জৈব সার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কম মূল্যে মানসম্মত জৈব সার সংগ্রহ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈব সারের নামে যদি বর্জ্য বা অনুপযুক্ত উপাদান সরবরাহ করা হয়, তাহলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়; বরং মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থার মান নিয়ন্ত্রণ, ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, কৃষকদের জন্য ঘোষিত সহায়তা কর্মসূচি সফল করতে শুধু বরাদ্দ দিলেই যথেষ্ট নয়; বরং নিশ্চিত করতে হবে যে প্রকৃত উপকারভোগীরা নির্ধারিত মানের উপকরণ পাচ্ছেন কি না। অন্যথায় উন্নয়নের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

