চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটির বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজতর করতে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে আয়োজিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে চীনের শতাধিক শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তা অংশ নেন এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৃহৎ ভোক্তা বাজার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং উন্নয়নশীল অবকাঠামো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তিনি চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রম এবং উৎপাদনভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করতে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, সরকারি সেবা ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রদান, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো অনুমোদন, তথ্যপ্রাপ্তি ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের জটিলতা। চীনে বাংলাদেশি বিনিয়োগ কার্যালয় চালু হলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা সরাসরি তথ্য, পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারবেন। ফলে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষায়িত শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে চলছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এসব প্রকল্প চালু হলে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের ফলে বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ শ্রমশক্তি, বাজার সুবিধা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সেবার মান বৃদ্ধি অপরিহার্য।
বিনিয়োগ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়। উৎপাদনশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় চালু হওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলগত উদ্যোগ। এর মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে এবং ভবিষ্যতে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত হতে পারে।বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

