চট্টগ্রাম নগরের বহুল আলোচিত মনোরেল প্রকল্প ঘিরে বড় ধরনের বিতর্কের অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট চুক্তি বাতিল করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত একটি উচ্চাভিলাষী গণপরিবহন প্রকল্পকে ঘিরে। চট্টগ্রামের যানজট নিরসন এবং আধুনিক নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মনোরেল নির্মাণের প্রস্তাব সামনে আসে। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। শুরু থেকেই এটি নগর উন্নয়নের অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে প্রচার পেতে থাকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পটির পেছনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কাউছার আলম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে মিসরভিত্তিক আন্তর্জাতিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ওরাসকম কনস্ট্রাকশন এবং দ্য আরব কন্ট্রাক্টরসের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সমঝোতা স্মারক ও পরবর্তী চুক্তি স্বাক্ষর করে।
তবে অনুসন্ধান এবং কূটনৈতিক পর্যায়ের যাচাইয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। ঢাকায় অবস্থিত মিসরের দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, কাউছার আলম চৌধুরী উল্লিখিত কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধি নন। সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও একই ধরনের অবস্থান জানানো হয়। তারা স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশে তাদের কোনো অনুমোদিত প্রতিনিধি নেই এবং আলোচিত ব্যক্তির সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্কও নেই।
এই তথ্য পাওয়ার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে অবহিত করে। এরপর সিটি করপোরেশন প্রকল্প-সংক্রান্ত সব সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। মেয়রের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বৈধ প্রতিনিধি নন বলে নিশ্চিত হওয়ার পর চুক্তি বহাল রাখার কোনো সুযোগ নেই।
ঘটনাটি শুধু একটি চুক্তি বাতিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ প্রকল্পটি শুধু সিটি করপোরেশনের পর্যায়ে আটকে থাকেনি; বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, সমন্বয় সভা এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনাতেও এটি স্থান পেয়েছিল। এমনকি বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প হিসেবে বিষয়টি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নজরেও আনা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বের বৈধ কাগজপত্র, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কিংবা অনুমোদনপত্রের কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছিল না। তারপরও প্রকল্পটি বিভিন্ন পর্যায়ে অগ্রসর হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক যাচাই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে গ্রেটার চিটাগাং ইকোনমিক ফোরামের সংশ্লিষ্টতা। প্রকল্প-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বৈঠক ও উপস্থাপনায় সংগঠনটির নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা দেখা গেছে। বিশেষ করে সংগঠনটির সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর নাম আলোচনায় এসেছে। তিনি বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাই হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
তবে এ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি। তিনি কীভাবে প্রকল্পটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন বা তাঁর ভূমিকার প্রকৃতি কী ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্যও প্রকাশ হয়নি। তবুও ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত চক্রটি শুধু চট্টগ্রামের মনোরেল প্রকল্পেই সক্রিয় ছিল না। খুলনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মোংলা বন্দরে বিনিয়োগ উদ্যোগের মতো আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়েও তারা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। ফলে পুরো বিষয়টি এখন একটি বৃহত্তর প্রতারণা নেটওয়ার্কের অংশ কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরে গণপরিবহন উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের পরিচয়, আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আইনি বৈধতা নিশ্চিত না করে এগোলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।
তাদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি ব্যর্থ চুক্তির গল্প নয়; বরং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ যাচাই-বাছাই, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখন প্রশ্ন হলো—কীভাবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে একটি কথিত কনসোর্টিয়াম এতদূর পর্যন্ত এগোতে পারল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত মনোরেল প্রকল্পের চুক্তি বাতিলের মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও এর পেছনের দায়, ত্রুটি এবং সম্ভাব্য জালিয়াতির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা যে আরও দীর্ঘ সময় চলবে, তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট।

