দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া শিগগিরই সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ধাপ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কমিশনের শীর্ষ পদগুলোতে কারা আসছেন, তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে।
রাষ্ট্রপতির নিয়োগের মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত হবে দুদকের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। এর আগে বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশনার ও চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হবে। গত ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ কমিশন শূন্য হয়ে পড়ে দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৫ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত সোমবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক। সদস্য হিসেবে আছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল ইসলাম, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
এই বাছাই কমিটি বিভিন্ন যোগ্য ব্যক্তির নাম সংগ্রহ করবে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে ছয়জনের একটি তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। সেই তালিকা থেকে তিনজনকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। পরে তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করবেন রাষ্ট্রপতি। এখন পর্যন্ত বাছাই কমিটির বৈঠক হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে।
চলতি বছরের মার্চ থেকেই ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র বিশেষ জজ মোতাহার হোসেনের নাম আলোচনায় আছে। ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি অর্থ পাচার সংক্রান্ত এক মামলায় তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দেন। সে সময় তিনি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক ছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরেই তিনি অবসরে যান।
এছাড়া আলোচনায় আছেন সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন আর্থিক প্রতিবেদন পরিষদের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া, নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক শহুদুল হক।
২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশির ভাগ সময়ই প্রশাসনের সাবেক সচিবদের মধ্য থেকেই চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম কমিশনে বিচার বিভাগের একজন বিচারপতিকে চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। ২০০৭ সালে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরীকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর অধিকাংশ সময় সাবেক সচিবরাই এই পদে দায়িত্ব পেয়েছেন।
অন্যদিকে বিভিন্ন কমিশনে কমিশনার হিসেবে বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার নজির রয়েছে। এবারও একই ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত মার্চের শুরুতে পুরো কমিশন পদত্যাগের সময় দুদকের অভিযোগ যাচাই-বাছাই কমিটিতে (যাবাক) কয়েক হাজার অভিযোগ পর্যালোচনায় ছিল। সেগুলোর মধ্যে কিছু অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হলেও কমিশন না থাকায় সিদ্ধান্ত হয়নি।
এরপরও প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ জমা হচ্ছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং কয়েকজন উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগও এসেছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে হয়রানি, ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগও জমা পড়ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, হাসপাতাল, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসহ বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ আসছে নিয়মিতভাবে।
দুদকের হটলাইন ১০৬ নম্বরেও প্রতিদিন অভিযোগ আসছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন কার্যালয়ে এসব অভিযোগ জমা হচ্ছে। তবে কমিশন না থাকায় এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিদায়ী কমিশনের অনুমোদিত অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম চালু রয়েছে।
তবে সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষ হয়েছে, সেগুলোর মামলা ও অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। কমিশন না থাকায় এসব কাজ আটকে আছে। অন্যদিকে কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও চাইলে তারা এসব কাজ চালিয়ে যেতে পারতেন।

