বরিশালের সুগন্ধা নদীর তীরবর্তী এলাকায় পরিচালিত একটি টায়ার ও প্লাস্টিক পাইরোলাইসিস কারখানা বন্ধের দাবিতে আইনি পদক্ষেপ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট দায়েরসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
গত ২৫ জুন বেলার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট ১০ জন কর্মকর্তার কাছে ‘ন্যায়বিচারের দাবিতে আইনি নোটিশ’ পাঠান। নোটিশে দাবি করা হয়েছে, বাবুগঞ্জ উপজেলার দোয়ারিকা এলাকায় অবস্থিত ‘পায়রা রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট’ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩-এর বিভিন্ন শর্ত উপেক্ষা করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বেলার অভিযোগ, কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, বিষাক্ত গ্যাস এবং শিল্পবর্জ্য আশপাশের পরিবেশের ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে এসব দূষণ নদীর পানি, কৃষিজমি, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। সংস্থাটির মতে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার এত কাছে এ ধরনের দূষণকারী শিল্পকারখানা পরিচালনা পরিবেশ আইন ও জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় চার বছর আগে কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে কারখানাটি স্থাপন করা হয়। শুরুতে এলাকাবাসী সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি উপলব্ধি করতে না পারলেও পরে কারখানার কালো ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। এরপর বাসিন্দারা কারখানাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গত বছর তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাদের।
অন্যদিকে কারখানার মালিক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে কারখানাটি বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, কারখানাটিতে সরাসরি প্রায় ৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবহৃত টায়ার সংগ্রহ, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে আরও অন্তত একশ পরিবারের জীবিকা এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তাই কারখানাটি বন্ধ হলে বহু মানুষের আয়ের উৎস হুমকির মুখে পড়বে।
বেলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুগন্ধা নদীর তীরে এ ধরনের শিল্পকারখানা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নদীর প্রতিবেশব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ, কৃষি উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর আরও বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। তাই পরিবেশগত ক্ষতি বাড়ার আগেই প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইরোলাইসিস প্রযুক্তি নিজেই দূষণকারী নয়। তবে যথাযথ পরিবেশগত মানদণ্ড, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া পরিচালিত হলে এ ধরনের কারখানা বায়ু ও পানি দূষণের বড় উৎসে পরিণত হতে পারে। সে কারণে অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত পরিবেশগত তদারকি এবং নির্গমন মান যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের দিকেই নজর স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের। সাত দিনের মধ্যে প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে নিষ্পত্তি হবে নাকি শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবে বেলা।

