দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছেই। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে হাম এবং হামের উপসর্গজনিত কারণে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১২ জনে। একই সময়ে নতুন করে এক হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু না হলেও হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬১৯ শিশু। এছাড়া পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুই ধরনের তথ্য একত্রে বিবেচনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১২ জনে।
সংক্রমণের চিত্রও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৫৭ শিশু। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১১৬ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। বাকি ৯৪১ জনের মধ্যে হামের লক্ষণ থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে নিশ্চিত পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়নি।
প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৯৯ হাজার ২০৭ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৭১০ জনে। অর্থাৎ, দেশে হামের বিস্তার এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্যও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। গত ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮২ হাজার ৮৪৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৭৯ হাজার ১৫২ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো টিকা গ্রহণ, আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে টিকাদান কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি, অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্ত এলাকায় নিবিড় নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব শিশু এখনও হামের টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

