দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিস্তার এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে একাধিক কর ও শুল্ক সুবিধা কার্যকর করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ খাতে আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
রবিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান অবস্থা, বাজেট বরাদ্দ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, নতুন অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
মন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রসারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সুবিধার ওপর থেকে সম্পূর্ণ শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি এ খাত থেকে অর্জিত আয়ের ওপর ২০৩১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি কর অবকাশের সুবিধাও বহাল রাখা হয়েছে। সরকারের বিশ্বাস, এসব নীতিগত সহায়তা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প উৎসের অংশগ্রহণ বাড়াবে।
তিনি আরও জানান, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। এবার সেই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মোট বরাদ্দের প্রায় পুরো অংশই উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ১৯২ কোটি ৮২ লাখ টাকা, আর পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৫২ কোটি ২২ লাখ টাকা। অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাজেটের খাতভিত্তিক বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ১৪ হাজার ৯৩৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং জ্বালানি বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ২৫৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের মতে, এই অর্থ বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী দাবি করেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় সরকার একটি সংকটাপন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পেয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে খাতটিতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দায় তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে বেশ কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে এমন চুক্তি ছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার বিষয়টি সরকারের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, এসব চুক্তি পরিবর্তন বা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিলে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি কার্যকর করার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এমন সমাধানের চেষ্টা চলছে, যাতে একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থও সুরক্ষিত হয়।
মন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করতে সরকার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির চাপ কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু কর ও শুল্ক সুবিধাই যথেষ্ট হবে না। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়ন, জমি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

