দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন মিললে আগামী জুলাই থেকেই নবম জাতীয় পে স্কেলের আওতায় সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর জুলাই মাসের মাঝামাঝি নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি রয়েছে। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও ধাপে ধাপে এর সুবিধা পেতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি চলতি সপ্তাহেই অর্থ মন্ত্রণালয়ে তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত পৃথক তিনটি পে কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে এই কমিটি বাস্তবায়নের একটি রূপরেখা তৈরি করেছে।
প্রাথমিকভাবে সরকার নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে তিন বছর এবং দুই বছর মেয়াদি দুটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছিল। তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় প্রথম দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে মূল বেতনের অংশ কার্যকর এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয়ের প্রস্তাব ছিল। তবে অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে দেখা যায়, মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করলে সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবিএএসপ্লাসপ্লাসে কারিগরি জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ কারণে মূল বেতন একবারেই পুরোপুরি কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
যদিও সামগ্রিক পে স্কেল বাস্তবায়ন দুই ধাপে সম্পন্ন করার দিকেই সরকারের পরিকল্পনা এগোচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। অনুমোদন মিললে জুলাইয়ের মাঝামাঝি অথবা তার পরবর্তী সপ্তাহে প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী বর্তমান ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় শতভাগ বা তার কাছাকাছি হারে মূল বেতন বৃদ্ধি পেতে পারেন। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে কর্মরতদের ক্ষেত্রে গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়নের বিস্তারিত প্রক্রিয়া তখন প্রকাশ করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামো সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার বেতন-ভাতা খাতে আলাদা করে বরাদ্দ না দেখিয়ে নেট পাবলিক সার্ভিস খাতের আওতায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ খাতে ব্যয় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে নতুন অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে এই বরাদ্দ থেকে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ৯ লাখ পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা সমন্বয় করা হবে। বর্তমানে সরকার শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতার জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্যও আংশিকভাবে কমবে। তবে একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রথম ধাপে সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর হয় এবং পরের বছরে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয় করা হয়। প্রায় ১১ বছর পর নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

