রাজধানীর অন্যতম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা ধানমন্ডির পরিবেশ, বসবাসের মান এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান বাণিজ্যিক নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রায় তিন দশক আগে প্রণীত নীতিমালাকে বর্তমান নগর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া ভবন ও প্লটগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করে অনিয়ম বা নীতিমালাবহির্ভূত ব্যবহার পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ জুন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ধানমন্ডির আবাসিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থাপনা এবং যানজট কমাতে বিদ্যমান নীতিমালা পুনর্বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, ১৯৯৫ সালে প্রণীত বাণিজ্যিক নীতিমালার আওতায় মিরপুর রোড, সাত মসজিদ রোড, গ্রিন রোড, পুরোনো ২ নম্বর সড়ক এবং পুরোনো ২৭ নম্বর সড়কসংলগ্ন কিছু প্লটে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে গত ৩১ বছরে রাজধানীর জনসংখ্যা, যানবাহনের সংখ্যা, নগরায়ণের ধরণ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফলে পুরোনো নীতিমালার অনেক ধারা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছে সরকার।
সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জানান, ধানমন্ডির বহু বাণিজ্যিক ভবনে পর্যাপ্ত গাড়ি রাখার ব্যবস্থা নেই। এর ফলে ভবনের ব্যবহারকারী ও দর্শনার্থীদের যানবাহন সড়কে পার্কিং করতে হয়। এতে প্রতিদিনই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নীতিমালায় পার্কিং, পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজায়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
সভায় অংশ নেওয়া ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, অনুমোদিত বাণিজ্যিক প্লটের পাশাপাশি অনেক আবাসিক ভবনও নিয়মের বাইরে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সামনে দিনের অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পার্কিং না থাকায় সড়কের ওপর গাড়ি দাঁড় করাতে বাধ্য হন ব্যবহারকারীরা, যা পুরো এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরাও মত দেন যে, ভবিষ্যতে কোনো প্লটকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত পার্কিং নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। পাশাপাশি নতুন নীতিমালাকে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, রাজউকের মাস্টার প্ল্যান এবং বিদ্যমান আইন-বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণয়ন করার সুপারিশ করা হয়।
সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নির্দেশনা দেন, ১৯৯৫ সালের নীতিমালার আওতায় বাণিজ্যিক অনুমতি পাওয়া সব প্লট ও ভবনের বর্তমান ব্যবহার পুনরায় যাচাই করতে হবে। কোনো ভবনে অনুমোদনের বাইরে কার্যক্রম পরিচালিত হলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর যেকোনো এলাকার প্লটের ব্যবহার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাজউককে অবশ্যই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন নিতে হবে বলেও তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা দেন।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, বিদ্যমান নীতিমালাকে আধুনিক নগর পরিকল্পনা ও বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে অতিরিক্ত সচিব (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনদের মতামত নিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে।
নতুন নীতিমালা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন কার্যক্রম চলবে। তবে নতুন নীতিমালায় পার্কিং ব্যবস্থাপনা, যানবাহন প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধা, পরিবেশগত ভারসাম্য, সবুজায়ন, নিরাপত্তা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়গুলোকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে নীতিনির্ধারকরা একমত হয়েছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ধানমন্ডি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকা হলেও ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের কারণে এর আবাসিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে যানজট কমানো, নাগরিক সেবা উন্নত করা, পরিবেশ রক্ষা এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর।

