বাংলাদেশের চিত্রকলা, টেলিভিশন এবং শিশুতোষ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কয়েক দশক ধরে চিত্রশিল্প, শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর অবদান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনের শেষ মুহূর্তে পরিবারের সদস্যরা তাঁর পাশে ছিলেন। দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী রুবেল জানান, রাত থেকেই তিনি হাসপাতালে অবস্থান করছিলেন। সকালে চিকিৎসকদের কাছ থেকে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর মরদেহ প্রথমে গোসল করানো হবে। এরপর রাজধানীর ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসভবনে নেওয়া হবে। জানাজা ও দাফনের সময় এবং স্থান পরে পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।
ব্যক্তিগত সহকারী রুবেল জানান, ১৯৯৪ সালে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় এবং পরবর্তী প্রায় ২৬ থেকে ২৭ বছর তিনি মুস্তাফা মনোয়ারের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে কাছ থেকে একজন শিল্পী, শিক্ষক এবং সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা ও মানবিক গুণাবলির সাক্ষী ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। শৈশব থেকেই শিল্প ও সাহিত্যের পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তাঁর সৃজনশীলতার ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেই নয়, একজন সফল উপস্থাপক, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং শিক্ষাবিদ হিসেবেও বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণ ও উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁর উদ্যোগে শিশুদের শিল্পচর্চা, কল্পনাশক্তির বিকাশ এবং সৃজনশীল শিক্ষা নতুন মাত্রা পায়।
চিত্রকলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। দেশীয় শিল্পধারার বিকাশ, নতুন শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শিল্পকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর শিল্পকর্মে দেশীয় ঐতিহ্য, প্রকৃতি, মানুষ এবং সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুতে শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, মুস্তাফা মনোয়ার এমন এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি শিল্পচর্চাকে শুধু ক্যানভাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং শিশুদের সৃজনশীল শিক্ষা, গণমাধ্যমে শিল্পের বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁরা স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর শিল্পকর্ম, শিক্ষা কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব যেমন স্মরণীয়, তেমনি একজন মানবিক ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবেও তিনি অগণিত মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর প্রস্থান দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হলেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম, আদর্শ এবং শিল্পচেতনা আগামী দিনেও বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করবে।

