জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিনটি অভিযোগে প্রতিটিতে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের সাজা দেওয়া হয়।
রায়ের দিন সকালে কারাগার থেকে ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। মামলায় তিনি একমাত্র আসামি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে আন্দোলন দমনে উসকানি, পরিকল্পনা ও সহায়তার অভিযোগ।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের একাধিক এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। নিহতরা হলেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। এতে আরও বহু মানুষ আহত হন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলন দমনে পরিকল্পিত উসকানি, নির্দেশনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইনুর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। একই বছরের ৩০ নভেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেন ২ জন। আটটি অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অভিযোগগুলো হলো— আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে উসকানি দেওয়া, সরকারি পর্যায়ের বৈঠকে দমনমূলক সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত থাকা, পুলিশ প্রশাসনকে তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া, আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইনু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। পরবর্তীতে ১৯ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে আন্দোলন দমনে সেনা মোতায়েন ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্তে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।
২০ জুলাই তিনি কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে। ২৭ জুলাই একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে চিহ্নিত করে বক্তব্য দেন এবং কঠোর দমননীতিকে সমর্থন করেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
২৯ জুলাইয়ের জোট বৈঠকে তিনি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবসহ আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানের পক্ষে মত দেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে। ৪ আগস্ট আন্দোলন দমনে গৃহীত পদক্ষেপে তার সমর্থন ও সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় সংঘটিত গুলিবর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার যোগসূত্র রয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, এসব ঘটনা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, উসকানি ও সহায়তার ধারাবাহিক অংশ ছিল, যার ফলেই কুষ্টিয়ায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

