বাংলাদেশে জমি কেনাবেচা, নামজারি কিংবা খাজনা পরিশোধের মতো সেবা দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে জটিল সরকারি প্রক্রিয়াগুলোর একটি। ঘুষ, দালালের দৌরাত্ম্য, অকারণ বিলম্ব এবং নথি জালিয়াতির অভিযোগ বহু বছর ধরে এই খাতকে ঘিরে রয়েছে। সেই বাস্তবতায় ভূমি প্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন সেবা, জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি এবং কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির মাধ্যমে সেবা সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই দুর্নীতি কমবে না; কার্যকর বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং মানুষের আস্থা অর্জনই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সরকারি কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতার সরাসরি যোগাযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। কারণ, সেবা নিতে মানুষের অফিসে যাতায়াত যত কম হবে, ঘুষ, হয়রানি এবং দালালচক্রের সুযোগও তত সংকুচিত হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে চালু করা হয়েছে ভূমি অ্যাপ, যেখানে এক প্ল্যাটফর্ম থেকেই বিভিন্ন ধরনের ভূমি-সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপটি ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি মানুষ ডাউনলোড করেছেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, ই-নামজারির আবেদন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, খতিয়ান ও মৌজার মানচিত্র অনুসন্ধান, ভূমির তথ্য যাচাই, ডিজিটাল খতিয়ানের কপি সংগ্রহ, অনলাইনে অভিযোগ দাখিল, উত্তরাধিকার অনুযায়ী সম্পত্তির অংশ হিসাব এবং জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ভূমির মালিকানা প্রোফাইল সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারের দাবি, এসব সেবা অনলাইনে সহজলভ্য হওয়ায় মানুষের সময় ও খরচ কমবে। একই সঙ্গে অফিসভিত্তিক অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও সীমিত হবে।
তবে দেশের সব মানুষ এখনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে সমানভাবে অভ্যস্ত নন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং ইন্টারনেট সুবিধার সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৮৯৩টি সেবাকেন্দ্র অনুমোদন দিয়েছে। সেখানে স্বল্প খরচে সাধারণ মানুষ অনলাইন ভূমি সেবা গ্রহণে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন।
একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ভিডিও নির্দেশিকা, তথ্যপত্র এবং বিভিন্ন প্রচারসামগ্রীর মাধ্যমে মানুষকে ডিজিটাল ভূমি সেবা ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবুও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি বদলায়নি। এখনো অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন, দালালের মাধ্যমে কাজ করালে ফাইল দ্রুত এগোয়। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু হলেও পুরোনো অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি অনেক সেবাগ্রহীতা।
ঢাকার একজন সেবাগ্রহীতা জানান, তিনি সম্প্রতি অনলাইনের মাধ্যমে কয়েকটি ভূমি-সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করেছেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সেবাকেন্দ্র থেকেও সহযোগিতা পেয়েছেন। তার অভিজ্ঞতায় আগের তুলনায় সময় ও ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
অন্যদিকে ঝিনাইদহের শৈলকুপার এক বাসিন্দার মতে, গ্রামীণ এলাকায় অনেক মানুষ এখনো স্মার্টফোন কিংবা অনলাইন সেবা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অনেক জায়গায় ইন্টারনেটের মানও সন্তোষজনক নয়। ফলে প্রযুক্তি চালু হলেও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়ানো না গেলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করছে, প্রযুক্তি একা দুর্নীতি দূর করতে পারবে না। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অনিয়ম, অনানুষ্ঠানিক প্রভাব এবং দালালনির্ভর সংস্কৃতি বদলাতে সময় লাগবে।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা শেষ হলে চালু হবে ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামে একটি ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থা। এতে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ভূমি অফিসের চারপাশে ভার্চুয়াল সীমানা নির্ধারণ করা হবে। কোনো কর্মকর্তা অফিস চলাকালে নির্ধারিত এলাকা ত্যাগ করলে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে তা সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাবে। এতে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ সহজ হবে এবং দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির সমস্যাও কমানোর আশা করছে সরকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, ভূমি প্রশাসন এবং জমি নিবন্ধন একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে নয়। অনেকেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অংশ মনে করলেও বাস্তবে সেটি আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। ফলে জমি নিবন্ধন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থেকে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে জাল দলিল, ভুল নথি এবং মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধের বড় অংশ নিবন্ধন পর্যায় থেকেই শুরু হয়।
এই সমস্যা কমাতে সরকার ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ সম্প্রসারণ, কেন্দ্রীয় ভূমি তথ্যভান্ডার তৈরি এবং নিবন্ধন ব্যবস্থাকে ভূমি তথ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর হিসাবে পাঠানোর জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজও চলছে। এতে মধ্যবর্তী হস্তক্ষেপ ও অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তিগত এসব উদ্যোগের মধ্যেও দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ভূমি-সংক্রান্ত সেবা গ্রহণকারী পরিবারের ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, প্রায় ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতি পরিবারে গড়ে অবৈধ অর্থ লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩১০ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, শুধু ভূমি খাতেই ঘুষের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে, যা জরিপে অন্তর্ভুক্ত সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
শুধু দুর্নীতিই নয়, ভূমি বিরোধ দেশের বিচারব্যবস্থার ওপরও বড় চাপ তৈরি করছে। বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে ৪৭ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ভূমি সংস্কার ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতে, এসব মামলার উল্লেখযোগ্য অংশই জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করা সময়ের দাবি এবং এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে মোবাইল অ্যাপ কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করাই শেষ কথা নয়। তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাঠপর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়ন, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং দালালচক্রের প্রভাব কমাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না।
তাদের মতে, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সফল করতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় নতুন প্রযুক্তি চালু হলেও পুরোনো দুর্নীতির ধরন কেবল নতুন রূপেই টিকে থাকতে পারে।

