ডিজিটাল মাধ্যমে জুয়া খেলা ও এর প্রচারণা-সংক্রান্ত অপরাধ আর সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় থাকবে না। জাতীয় সংসদে পাসের জন্য উত্থাপিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত ধারা সম্পূর্ণ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফলে একসময় যে অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান ছিল, তা এখন সাইবার সুরক্ষা আইন থেকে বাদ যাচ্ছে। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একই অপরাধের জন্য একাধিক আইনের প্রয়োগজনিত জটিলতা এড়াতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সংশোধনী বিলটি উত্থাপন করেন। বিলটি পাস হলে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০ নম্বর ধারা পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাবে।
বর্তমান আইনে সাইবার স্পেসে জুয়া পরিচালনা, জুয়ার জন্য ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা অন্য কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও পরিচালনা, জুয়ায় অংশগ্রহণ, অন্যকে উৎসাহ দেওয়া কিংবা জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মতো কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান ছিল।
এই বিধানটি মূলত ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে শুরু হয়ে পরে ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইনেও বহাল ছিল। তবে নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সেটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হচ্ছে।
সরকার বলছে, সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের ডিজিটাল পরিসরকে নিরাপদ রাখা এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ধরনের জুয়া ও বেটিং কার্যক্রম মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত ও বিশেষায়িত আইনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এই কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ নামে পৃথক একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন আইনে শুধু অনলাইন নয়, সব ধরনের জুয়া ও বেটিং কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সমন্বিত বিধান রাখা হবে বলে সরকারের পরিকল্পনা।
সংশোধনী বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একই ধরনের অপরাধ যদি একাধিক আইনের আওতায় পড়ে, তাহলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধকে একটি বিশেষ আইনের অধীনে এনে আইন প্রয়োগকে আরও কার্যকর ও সুসংহত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিলটি সংসদে পাস হওয়ার পর সংশোধিত বিধান অবিলম্বে কার্যকর হবে। এরপর থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার সাইবার সুরক্ষা আইনের পরিবর্তে নতুন প্রস্তাবিত জুয়া প্রতিরোধ আইনের আওতায় পরিচালিত হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একই অপরাধের জন্য একাধিক আইনে পৃথক বিধান থাকলে তদন্ত, অভিযোগ গঠন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিষয়ভিত্তিক পৃথক আইন প্রণয়ন করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আদালয়ের জন্য দায়িত্ব পালনে আরও স্পষ্টতা আসতে পারে।
তবে তারা মনে করেন, শুধু আইন পরিবর্তন করলেই অনলাইন জুয়া বা বেটিং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। এর পাশাপাশি শক্তিশালী সাইবার নজরদারি, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের বিস্তার সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। তাই নতুন আইনে যদি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত অবৈধ জুয়া কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ফল পাওয়া যেতে পারে।

