গত এক দশকের বেশি সময়ের তুলনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তার ভাষ্য, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অধিকাংশ অপরাধের সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে ধর্ষণ মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে বলে স্বীকার করে তিনি এর পেছনে মামলা গ্রহণ ও অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া সহজ হওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকার বরাদ্দ অনুমোদন দেয় সংসদ।
বিরোধী দলের সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের হাতে থাকা অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী অধিকাংশ সূচকেই আগের বছরের তুলনায় উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে গত ১০ থেকে ১৫ বছরের চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান অবস্থাকে তিনি ‘ঐতিহাসিক উন্নতি’ বলে উল্লেখ করেন।
ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, অতীতে সামাজিক, পারিবারিক কিংবা রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে পারতেন না। বর্তমানে থানায় গিয়ে কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে সাধারণ ডায়েরি ও প্রথম তথ্য প্রতিবেদন দায়েরের সুযোগ সহজ হওয়ায় অনেক বেশি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হচ্ছে। তার মতে, এ কারণেও মামলার সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সরকারের অগ্রগতির দাবি করেন তিনি। সাম্প্রতিক একটি আলোচিত হত্যা মামলার বিচার মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়াকে দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি নজির হিসেবে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকা তনু হত্যা মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার ভিত্তিতে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কথাও তুলে ধরেন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচার ও গ্রেপ্তারের একমাত্র ভিত্তি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ডগ স্কোয়াড, আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জাম যুক্ত করা হবে। কারণ মাদক চক্রের সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে সশস্ত্র থাকে, ফলে তাদের মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি আরও জানান, অনলাইন জুয়া, সাইবার অপরাধ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক আমলের ১৮৬৭ সালের জুয়া আইন বাতিল করে সময়োপযোগী নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
এর আগে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, চুরি এবং নারী-শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ, ২ হাজার ২১৪টি চুরি এবং ৩ হাজার ৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে পুলিশ সদস্যদের ওপরও ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি সেই দক্ষতা যদি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হতো, তাহলে বাজেট কমানোর প্রস্তাব দিতে হতো না।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্য বিরোধী সদস্যকে ধন্যবাদ। তবে তিনি দাবি করেন, কয়েক দিন আগে সংসদে অপরাধভিত্তিক বিস্তারিত পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আলোচনা শেষে বিরোধী দলের আনা বাজেট ছাঁটাই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকার বাজেট সংসদে অনুমোদন পায়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের ভিন্নমুখী মূল্যায়ন সংসদে আবারও সামনে এসেছে। একদিকে সরকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত বিচার এবং প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার অগ্রগতির কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী দল মাঠপর্যায়ের অপরাধ পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে নতুন অর্থবছরে বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতিই শেষ পর্যন্ত সরকারের দাবির বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটেছে, সেটিই পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।

